একটি রাজনৈতিক দল কর্মজীবী নারীদের নিয়ে যে মন্তব্য করেছে, তা কলঙ্কজনক বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দল এই যে বাংলাদেশের অর্ধেক নারী গোষ্ঠীকে তারা কীভাবে ঘরের মধ্যে আটকে রাখতে চায়, সেই কথা তারা বলেছে।’ সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে খুলনা নগরের খালিশপুর এলাকার প্রভাতী স্কুল মাঠে বিএনপির নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
দীর্ঘ ২২ বছর পর খুলনায় গিয়ে নির্বাচনী জনসভায় যোগ দেন তারেক রহমান। সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তিনি প্রভাতী স্কুল মাঠে পৌঁছান। মঞ্চে উঠলে নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা করতালির মাধ্যমে তাঁকে স্বাগত জানান। তারেক রহমান হাত নেড়ে উপস্থিত জনতার শুভেচ্ছার জবাব দেন। প্রায় ২৭ মিনিটের বক্তব্যে তিনি সমসাময়িক রাজনীতি, নির্বাচন ও নারীর অধিকার নিয়ে বক্তব্য দেন।
কারও নাম উল্লেখ না করে তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা দেখেছি, একটি রাজনৈতিক দলের নেতা দুই দিন আগে পরিষ্কারভাবে বলেছেন, যেসব নারী, যেসব মা–বোন কর্মসংস্থানের জন্য যান, আপনাদের সামনে বলতে রীতিমতো লজ্জা হচ্ছে, এমন একটি শব্দ মা–বোনদের জন্য ব্যবহার করেছেন, যা এ দেশের জন্য কলঙ্কস্বরূপ।’ তিনি বলেন, এ ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে অবমাননা করা হয়েছে।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশের লাখ লাখ নারী পোশাকশিল্পে কাজ করে দেশের অর্থনীতি সচল রেখেছেন। নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বহু নারী দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সংসার চালাতে স্বামীর পাশাপাশি কাজ করছেন। অথচ এই কর্মজীবী নারীরাই আজ অবমাননার শিকার হচ্ছেন। হজরত বিবি খাদিজা (রা.)–এর উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘যারা ইসলাম কায়েমের কথা বলে, তারা ভুলে যাচ্ছে, নবী করিম (সা.)-এর সহধর্মিণী হজরত বিবি খাদিজা (রা.) ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। তাহলে নারীদের কর্মজীবনকে অপমান করার এখতিয়ার কারও নেই।’
তারেক রহমান আরও বলেন, ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল আইডি হ্যাকড হওয়ার অজুহাত দিয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন, এভাবে আইডি হ্যাকড হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাঁর ভাষায়, ‘নির্বাচনের আগে জনগণের সামনে মিথ্যাচার করে তারা নিজেদের আসল চরিত্র প্রকাশ করছে। যারা নারীদের অসম্মান করে, যারা মিথ্যার আশ্রয় নেয় এবং যারা জনগণের ভোটাধিকার হরণ করেছে, তারা কখনো দেশপ্রেমিক বা জনদরদি হতে পারে না।’
জনসভায় দেশের প্রতিটি পরিবারে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়ার ঘোষণাও দেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি, যার মধ্যে অন্তত ১০ কোটি নারী। এই বিশাল নারীসমাজকে পেছনে রেখে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনাই সফল হতে পারে না। বিএনপি সরকার গঠন করলে এই কার্ডের মাধ্যমে নারীদের ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী করে তোলা হবে, যাতে তাঁরা কারও মুখাপেক্ষী হয়ে না থাকেন।
খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা অঞ্চলের উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একসময়ের শিল্পনগরী খুলনা আজ মৃতপ্রায়। বিএনপি ক্ষমতায় এলে এই অঞ্চলকে আবার জীবন্ত শিল্পনগরীতে রূপান্তর করা হবে এবং নারী-পুরুষ উভয়ের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে। তাঁর মতে, দেশের নারীসমাজকে স্বাবলম্বী করা, বেকারদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষার সঠিক পরিবেশ ও উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলেই জনগণের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ১২ তারিখের নির্বাচন উপলক্ষে এই জনসভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত ১৫ থেকে ১৬ বছরে বিএনপি বহু আন্দোলন ও সংগ্রাম করেছে। এই সময়ে দলের বহু নেতা-কর্মী গুম, খুন ও হত্যার শিকার হয়েছেন। বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হাজার হাজার নেতা-কর্মী গায়েবি মামলা, নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। এরপরও ২০২৪ সালের জুলাই মাসে দলমত–নির্বিশেষে জনগণ রাজপথে নেমে এসে স্বৈরাচারকে বিদায় করেছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর ভাষায়, ‘আজ সময় এসেছে অধিকার আদায়ের। ১২ তারিখে ইনশা আল্লাহ বাংলাদেশের মানুষ সেই অধিকার প্রয়োগ করবেন, যা থেকে এক যুগের বেশি সময় ধরে তাঁদের বঞ্চিত করে রাখা হয়েছিল।’
বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রথম দায়িত্ব হবে দেশ পুনর্গঠন—এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দল-মত ও শ্রেণি-পেশানির্বিশেষে সবাইকে নিয়েই দেশ গড়তে হবে। শুধু একটি শ্রেণিকে নিয়ে কখনোই দেশ পুনর্গঠন সম্ভব নয়। গত ১৬ বছর ধরে মানুষ জাতীয় ও স্থানীয় কোনো নির্বাচনেই প্রকৃতভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
সিএ/এমই


