প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ঐকমত্য গঠন) মনির হায়দার বলেছেন, ‘বাংলাদেশে যেন আর কখনো কোনো অভ্যুত্থানের প্রয়োজন না হয়—এই অঙ্গীকারের ভিত্তিতে গণভোটের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর কোনো বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ নয়, কোনো মা-বাবাকে যেন আর সন্তানের লাশ কাঁধে নিতে না হয়। এই পথ বন্ধ করার জন্যই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে।’
রবিবার (১ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১১টায় সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে গণভোট বিষয়ে জনসচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা সংক্রান্ত মতবিনিময়সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) যৌথ আয়োজনে চবির সমাজবিজ্ঞান অনুষদের অডিটরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আইয়ুব ইসলাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার সভার প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, ট্রেজারার, ডিন, রেজিস্ট্রারসহ ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ শিক্ষার্থীদের অভিভাবক এবং আহত শিক্ষার্থীরা সভায় অংশ নেন।
মনির হায়দার বলেন, ‘গণভোট কোনো হঠাৎ সিদ্ধান্ত নয়। ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোট একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফল। এটি কারো মাথা থেকে হঠাৎ চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা, মতবিনিময় এবং অভিজ্ঞ মহলের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেই গণভোটের প্রশ্ন ও কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি কোনো দলীয় স্বার্থের বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রকে একটি টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক পথে নেওয়ার সম্মিলিত প্রয়াস। গণভোট মানে জনগণের কণ্ঠস্বরকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। জনগণের সম্মতি ছাড়া রাষ্ট্রের মৌলিক প্রশ্নে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই—এই গণভোট তারই প্রমাণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘যারা গণভোটকে হঠাৎ সিদ্ধান্ত বলে প্রচার করছে, তারা হয় প্রক্রিয়াটি জানে না, নয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। গণভোটের প্রতিটি ধাপ রাজনৈতিক ঐকমত্য ও বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে সাজানো হয়েছে। তবে সময় স্বল্পতার কারণে গণভোটের বিষয়বস্তু অনেকের কাছেই এখনো পরিষ্কার নয়; এমনকি শিক্ষিত ও জ্ঞানী মহলেও বিভ্রান্ত। তাই গণভোটের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট নিজ নিজ নেটওয়ার্কে তুলে ধরার দায়িত্ব আপনাদেরই নিতে হবে।’
মনির হায়দার বলেন, ‘৫৪ বছরের ইতিহাসে একবার মাত্র সংবিধান সংস্কার হয়েছে জাতীয় স্বার্থে। বাকি সব সংশোধনী হয়েছে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থে। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার থেকে সংসদীয় সরকারে যায়। এবং সেটার জন্যই সংবিধান সংস্কার ও গণভোট দেওয়া হয়েছিল। বাকি সব সংশোধনী ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীর স্বার্থেই করা হয়েছে।’
তিনি আরও জানান, বর্তমান সংশোধনী অনুযায়ী ১০০ সদস্য বিশিষ্ট আরেকটি সংসদ হবে, যারা নির্বাচিত হবে প্রজাতান্ত্রিক (PR) পদ্ধতি অনুযায়ী। কোনো দল যদি জাতীয় নির্বাচনে একটি আসন না পায় কিন্তু নির্দিষ্ট শতাংশ ভোট পায়, তাহলে তার একজন সদস্য সেখানে থাকবেন। অতীত নির্বাচন বিবেচনা করলে দেখা গেছে, ৪০ শতাংশের বেশি কেউ ভোট পায়নি। কিন্তু ৫১ শতাংশের নিয়ম প্রবর্তিত হলে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য অন্য কারোর সঙ্গে পরামর্শ নিতে হবে।
মনির হায়দার বলেন, ‘বিশেষ কিছু আইন পাস করার ক্ষেত্রে দুই পক্ষের অনুমতির পরেও গণভোটের মাধ্যমে তা নির্ধারণ করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, ভবিষ্যতে কেউ যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করতে চায়, তাহলে দুই কক্ষে অনুমতির পাশাপাশি গণভোটও জিততে হবে।’
রাষ্ট্রপতি নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি সাধারণত প্রধানমন্ত্রী ও বিচারপতি নিয়োগ করতে পারেন। তবে বাস্তবে বিচারপতি প্রধানমন্ত্রী যাকে চান, তাকেই নিয়োগ দিয়ে থাকেন। অতীতের কিছু রাষ্ট্রপতি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে গিয়ে জোকিং করতেন এবং দেশের বাইরে কোটি কোটি টাকা খরচ করতেন। এখন থেকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ হবে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সকল সদস্যের গোপন ব্যালটের মাধ্যমে।’
সংসদ সদস্যদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অনুচ্ছেদ ১৭ সংসদের একটি কালো অনুচ্ছেদ, যার মাধ্যমে সংসদ সদস্যরা দলের গোলামে পরিণত হন। এবার গণভোটের মাধ্যমে পরিবর্তন আসবে। শুধু তিনটি ক্ষেত্রে দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া যাবে না; ১। আস্থা ভোট, ২। রাষ্ট্র যখন জরুরি অবস্থায় থাকে, ৩। জাতীয় বাজেট।’
নির্বাচন কমিশন সম্পর্কেও তিনি বলেন, ‘৫৪ বছরে দেশে যত রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তার প্রধান কারণ নির্বাচন কমিশন গঠন। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন প্রধানমন্ত্রী গঠন করে থাকেন এবং সাধারণত তার পছন্দমতো দেন। জুলাই সনদে বলা আছে—নির্বাচন কমিশন ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল এবং পার্লামেন্টের সবাই বসে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে গঠন করা হবে। সরকারি কর্মকমিশন গঠনের ক্ষেত্রেও নিরপেক্ষভাবে গঠন করা হবে।’
সভায় চবি উপাচার্য প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার বলেন, ‘জাতির জীবনে বারবার এ ধরনের সুযোগ আসে না। সর্বশেষ ১৯৭১ সালে আমরা রক্তদানের মাধ্যমে ঐতিহাসিক সুযোগ পেয়েছিলাম। কিন্তু স্বাধীনতার পর সরকার ঐক্যবদ্ধ না হয়ে মুক্তিযুদ্ধকে কুক্ষিগত করে লুটপাটে লিপ্ত হওয়ায় সেই সুযোগ হারিয়েছি। এবার সুযোগ এসেছে। যদি এই সুযোগ হারাই, দায়ভার সবার ওপরই বর্তাবে।’
অনুষ্ঠানে চবি উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন, রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আতিউর রহমান, আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের ভিসি প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আলী আজাদ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত শিক্ষার্থী মোহাম্মদ শুভ হোসেন, শহীদ চবি শিক্ষার্থী ফরহাদ হোসেনের বড় ভাই গোলাম কিবরিয়া প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
সিএ/এএ


