মহাকাশ ও মানুষের মনের সম্পর্ক নিয়ে মানুষের কৌতূহল বহু পুরোনো। মানুষ কি কেবল পৃথিবীর বাসিন্দা, নাকি অজান্তেই মহাজাগতিক কোনো শক্তি তার আচরণ ও অনুভূতিকে প্রভাবিত করে—এই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে বিজ্ঞান ও কল্পনার সংযোগস্থলে। চাঁদ, সৌরজগতের ছন্দ ও কসমিক শক্তির সঙ্গে মানুষের অবচেতন মনের যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা চলছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক ম্যাগাজিন পপুলার মেকানিক্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চালানো গবেষণায় চাঁদকে ঘিরে প্রচলিত বহু গল্প ভিত্তিহীন প্রমাণিত হলেও, কিছু ক্ষেত্রে আংশিক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে।
অনেকের বিশ্বাস, পূর্ণিমার সময় মানুষের মেজাজ বেশি উগ্র হয়, দুর্ঘটনা বাড়ে এবং হাসপাতালের জরুরি বিভাগে রোগীর চাপ বেড়ে যায়। এমনকি বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, হাসপাতালকর্মীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই ধারণায় বিশ্বাস করেন। তবে প্রায় তিন দশক ধরে পরিচালিত গবেষণাগুলোতে এই দাবির শক্ত প্রমাণ মেলেনি।
১৯৮০–এর দশকে অ্যানালস অফ ইমার্জেন্সি মেডিসিনে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, পূর্ণিমা ও অন্যান্য দিনের মধ্যে গুরুতর আহত রোগীর সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য নেই। একইভাবে ২০১৪ সালে ইনজুরি জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, পূর্ণিমা ও অমাবস্যার সময় দুর্ঘটনার হার প্রায় সমান।
তবে বন্যপ্রাণীর ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। ট্রান্সপোর্টেশন রিসার্চ পার্ট ডি–তে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, পূর্ণিমার রাতে গাড়ি ও বন্যপ্রাণীর সংঘর্ষ প্রায় ৪৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায়। গবেষকদের মতে, পূর্ণিমার আলোতে বন্যপ্রাণীরা বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠাই এর প্রধান কারণ।
চন্দ্রচক্র ও নারীদের মাসিক চক্রের মিল নিয়েও বহু আলোচনা রয়েছে। চন্দ্রচক্রের দৈর্ঘ্য ২৯ দশমিক ৫ দিন হওয়ায় অনেকেই মনে করেন, মাসিক চক্র চাঁদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে। তবে কোটি কোটি মানুষের পিরিয়ড ট্র্যাকিং অ্যাপের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, চাঁদের দশার সঙ্গে মাসিক চক্রের কোনো স্থায়ী সম্পর্ক নেই।
ঘুমের ক্ষেত্রে চাঁদের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি আলোচনায় এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, পূর্ণিমার আগের কয়েক রাতে অনেক মানুষ দেরিতে ঘুমাতে যান এবং ঘুমের সময় কমে আসে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এটি মানুষের বিবর্তনীয় অতীতের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, যখন প্রাকৃতিক আলো মানুষের সামাজিক ও দৈনন্দিন কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।
সব মিলিয়ে, চাঁদের প্রভাব মানুষের ওপর অতিপ্রাকৃত নয়। তবে মহাজাগতিক এই ছন্দ ও মানুষের আগ্রহ ইতিহাসজুড়ে সমানভাবে টিকে আছে।
সিএ/এমআর


