বাংলাদেশে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ, আর্থিক অনিয়ম ও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে সঞ্চয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কোথায় বিনিয়োগ করলে তুলনামূলক নিরাপদ থাকা যায়। এই প্রেক্ষাপটে স্বর্ণ, সঞ্চয়পত্র, জমি-আবাসন, ডিপিএস এবং সরকারি ট্রেজারি বন্ড আবারও আলোচনায় এসেছে।
মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকটের সময়ে মানুষ সাধারণত বিকল্প বিনিয়োগ খুঁজে নেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব খাতের প্রত্যেকটিরই সুবিধা ও ঝুঁকি রয়েছে। বিনিয়োগের আগে সেগুলো ভালোভাবে বোঝা জরুরি।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন বা বাজুসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম প্রথমবারের মতো লাখ টাকা ছাড়ায়। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে বর্তমানে তা বেড়ে আড়াই লাখ টাকার বেশি হয়েছে। খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, দীর্ঘ মেয়াদে স্বর্ণের দাম কমার প্রবণতা খুবই সীমিত।
বাজুসের স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং এন্ড প্রাইস মনিটরিংয়ের চেয়ারম্যান দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন বলেন, ‘আম্মার বিয়ের সময় ছিল ৮০ টকা। এরপর এটা বাড়তে বাড়তে ১০ হাজার, ৫০ হাজার, এক লাখ হলো। এখন আড়াই লাখ। মানি ডিভ্যালুয়েশনের জন্য গতকাল এটা পাঁচ লাখ ক্রস করছে।’ তার মতে, স্বর্ণ এমন একটি সম্পদ, যা বৈশ্বিক অস্থিরতায় আরও শক্তিশালী হয়।
বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে স্বর্ণের দামের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক মন্দা বা অস্থিরতার সময় স্বর্ণের দাম বাড়ে। এ কারণেই বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ডলারসহ বৈদেশিক মুদ্রার পাশাপাশি স্বর্ণকে রিজার্ভ হিসেবে ধরে রাখে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ স্বর্ণভাণ্ডার রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছেও প্রায় ১৪ দশমিক ৮ টন স্বর্ণের রিজার্ভ আছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টাকার মান কমে গেলে বা ব্যাংক খাতে অনাস্থা তৈরি হলে সাধারণ মানুষ স্বর্ণে ঝুঁকে পড়েন। কারণ স্বর্ণের মূল্য কোনো সরকারের নীতিনির্ধারণ বা কোনো একটি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার ওপর নির্ভরশীল নয়। তবে তারা মনে করিয়ে দেন, স্বর্ণে বিনিয়োগ করলে ২৪ ক্যারেট পিওর গোল্ড কয়েন বা বার কেনাই ভালো, গয়না নয়।
স্বর্ণের পর নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সঞ্চয়পত্রের কথাও বলছেন অর্থনীতিবিদরা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ব্যাংক খাত দুর্বল থাকায় সঞ্চয়পত্র এখনও মানুষের আস্থার জায়গা। কারণ এটি সরকার ইস্যু করে এবং মেয়াদ শেষে মুনাফাসহ টাকা ফেরতের নিশ্চয়তা থাকে। পাশাপাশি কর রেয়াতের সুবিধাও রয়েছে।
তবে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের সীমা রয়েছে এবং মেয়াদ পূর্তির আগে ভাঙালে কর রেয়াত বাতিল হয়। পরিবার সঞ্চয়পত্র ও পেনশন সঞ্চয়পত্র বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয়, যেখানে প্রায় ১২ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা পাওয়া যায়।
দীর্ঘমেয়াদে জমি ও আবাসন খাতকেও তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়। জনসংখ্যা বেশি ও জমি সীমিত হওয়ায় সাধারণত জমির দাম বাড়ে। তবে এই খাতে তারল্য কম, জরুরি সময়ে দ্রুত বিক্রি করা কঠিন এবং আইনি জটিলতার ঝুঁকিও থাকে।
ডিপোজিট পেনশন স্কিম বা ডিপিএসেও অনেকে বিনিয়োগ করেন। কিছু ব্যাংক সাত থেকে সাড়ে সাত শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা দেয়। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা বা ‘হেলথ’ যাচাই করা জরুরি বলে মনে করেন ড. ফাহমিদা খাতুন।
সরকারি ট্রেজারি বন্ড ও বিলও তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ইস্যু হওয়া এসব বন্ডে চার থেকে আট শতাংশ পর্যন্ত সুদ পাওয়া যায় এবং প্রতি ছয় মাস অন্তর মুনাফা তোলার সুযোগ থাকে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, নিরাপদ বিনিয়োগ বলে একক কোনো বিষয় নেই। বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে হলে নিজের আয়, লক্ষ্য, সময় এবং ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতা বিবেচনা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আতঙ্কের বশে সিদ্ধান্ত নিলে ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি।
সিএ/এএ


