বরিশালের মুলাদী উপজেলায় নির্বাচনী প্রচারণায় ভিন্ন আবহ তৈরি করেছেন হাবিবা কিবরিয়া। বুধবার (২২ জানুয়ারি) মুলাদীর একটি দলীয় কার্যালয়ে তার বক্তব্য ছিল শুধু রাজনৈতিক প্রচার নয়, বরং একজন মেয়ের দীর্ঘ অপেক্ষা, বাবাকে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং ভোটের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসের প্রতিফলন।
হাবিবা কিবরিয়ার বাবা জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপু বর্তমানে কারাবন্দি। কারাগারে থেকেই তিনি বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তিনবারের সংসদ সদস্য টিপুর পক্ষে দলীয় প্রতীক পাওয়ার পরই মুলাদীতে ছুটে যান তার মেয়ে হাবিবা।
মুলাদীর দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত ঘরোয়া সভায় হাবিবা কিবরিয়া বলেন, তারা প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না। তার ভাষায়, রাজনীতি যদি খেলায় পরিণত হয়, তবে সেই খেলার সবচেয়ে বড় শিকার তার বাবা। মামলা, জামিন এবং আবার মামলার চক্রের কথা তুলে ধরে তিনি একে ‘বরফ পানি, বরফ পানি’ খেলার সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি বলেন, এই অবস্থার জবাব রাজপথে নয়, ভোটের মাধ্যমেই দিতে হবে।
বাবার সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে হাবিবা বলেন, গোলাম কিবরিয়া টিপু তার কাছে শুধু একজন রাজনীতিক নন, তিনি একজন বাবা। একই সঙ্গে তিনি হাজার হাজার মানুষের আপনজন। কারো সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক, কারো সঙ্গে আত্মার টান রয়েছে তার বাবার। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাবা কারাগারে থাকলেও মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের কোনো বিচ্ছেদ ঘটেনি।
দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে হাবিবা কিবরিয়া স্মরণ করিয়ে দেন, তার বাবা সব সময় একতায় বিশ্বাস করতেন। সেই একতার শক্তিতেই ঘরে ঘরে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তার একটাই বার্তা, একটি ভোট। তার বিশ্বাস, সেই ভোটই কারাগারের তালা খুলতে পারে।
নারী ভোটারদের ভূমিকার ওপর আলাদা গুরুত্ব দিয়ে হাবিবা বলেন, শুধু ঘরের দরজায় কড়া নাড়লেই হবে না, মানুষের মনের দরজায় পৌঁছাতে হবে। কীভাবে সেই কাজ করতে হবে, সেই দায়িত্ব মাঠের নারী কর্মীদের ওপর ছেড়ে দেন তিনি।
একপর্যায়ে বক্তব্য আরও ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে। ঢাকায় সংসার, পাঁচ বছরের সন্তান এবং শ্বশুর-শাশুড়িকে রেখে বরিশালে অবস্থানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এই নির্বাচন তার কাছে শুধু রাজনৈতিক লড়াই নয়, এটি একজন মেয়ের বাবাকে ফিরিয়ে আনার লড়াই। এক বছর দুই মাস আট দিন ধরে বাবার কারাবন্দী থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে ক্ষোভ নয়, আছে স্থির প্রত্যয়।
হাবিবা কিবরিয়া বলেন, একজন মানুষকে কারাগারে রাখা যায়, কিন্তু হাজার হাজার মানুষকে নয়। সরকার চাইলে তার বাবাকে বন্দি রাখতে পারে, তবে ভোটের মাধ্যমে জনগণই জবাব দেবে। কারাগারে থেকেও নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বাবাকে ফুলের মালা দিয়ে ফিরিয়ে আনার দৃশ্যের কথাও তিনি তুলে ধরেন।
নির্বাচনী মাঠে উত্তেজনা বা পাল্টা বক্তব্যে না জড়ানোর আহ্বান জানিয়ে হাবিবা কিবরিয়া বলেন, অপমানজনক কথা আসতে পারে, কটু কথা শোনাও অস্বাভাবিক নয়। তিনি নিজেও সেসব সহ্য করেছেন বলে উল্লেখ করেন। তবে আবেগ নয়, ধৈর্য ও শান্ত থাকাই এই লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় কৌশল বলে তিনি মত দেন।
গোলাম কিবরিয়া টিপুর রাজনৈতিক জীবনের শুরু আওয়ামী লীগের মাধ্যমে। তিনি রমনা থানা যুবলীগের সহ-সভাপতি ছিলেন। পরে বিএনপিতে যোগ দিয়ে স্বেচ্ছাসেবক দলের ঢাকা মহানগরের সাধারণ সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি হন। আশির দশকে তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে প্রেসিডিয়াম সদস্য হন। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৩ আসন থেকে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনেও একই আসন থেকে সংসদ সদস্য হন।
২০২৪ সালে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৩ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের সমর্থনে নির্বাচিত হলেও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর সংসদ বিলুপ্ত হওয়ায় তিনি সংসদ সদস্য পদ হারান। ওই ঘটনার পর ঢাকায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সিএ/এএ


