মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় আপাতত নীতি সুদহার কমানোর ঝুঁকিতে যেতে চাইছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। গত বছরের অক্টোবরের পর নভেম্বর ও ডিসেম্বর—টানা দুই মাস মূল্যস্ফীতি বাড়ায় আসন্ন মুদ্রানীতিতেও সংকোচনমূলক অবস্থান বহাল রাখার দিকেই ঝুঁকছেন নীতিনির্ধারকেরা। এর সঙ্গে ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন খাতে চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনাও সিদ্ধান্তে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে জানুয়ারি-জুলাই সময়ের জন্য প্রণীত হতে যাওয়া নতুন মুদ্রানীতিতেও শিথিলতার সম্ভাবনা কম বলেই আভাস মিলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, সম্প্রতি গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত নীতিনির্ধারণী আলোচনায় ১০ শতাংশ নীতি সুদহার বা রেপো রেট অপরিবর্তিত রাখার পক্ষে মত প্রাধান্য পেয়েছে। আগামী ২২ জানুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য মুদ্রানীতির কোর কমিটির বৈঠকেও এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে, এ মুহূর্তে বেসরকারি বিনিয়োগে গতি আনার চেয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। সে কারণেই ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর মতো কোনো শিথিলতার পথে যাচ্ছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
নীতিগত আলোচনায় আরও জানা গেছে, শুধু রেপো হার নয়, সুদের হার করিডরের অন্যান্য সূচকেও বড় কোনো পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা নেই। স্ট্যান্ডিং ল্যান্ডিং ফ্যাসিলিটির (এসএলএফ) ঊর্ধ্বসীমা, স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটির (এসডিএফ) নিম্নসীমা এবং ওভারনাইট রেপো হার প্রায় অপরিবর্তিত রাখা হতে পারে। এতে ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে স্বল্পমেয়াদি যে আমানত রাখে, তার সুদ কিছুটা কমলেও ধার নেওয়ার ব্যয় কমার সম্ভাবনা নেই। ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার পরিস্থিতি আপাতত অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত মিলছে।
তবে অর্থনীতিবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম মনে করেন, ডলারের বাজার এখন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল এবং আমদানির ব্যয়ও আগের মতো চাপের মধ্যে নেই। এই বাস্তবতায় সংকোচনমূলক নীতিতে কিছুটা শিথিলতা আনার সুযোগ ছিল বলে তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্য হলো, মূল্যস্ফীতি যদি ধীরে ধীরে ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে নেমে আসে, তাহলে উৎপাদন ব্যয় কমবে, সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বস্তি ফিরবে, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি সহজ হবে এবং কর্মসংস্থানেও গতি আসবে। তবে সে পর্যায়ে পৌঁছাতে এখনো সময় লাগবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সতর্ক অবস্থানকে জোরালো করছে। অক্টোবর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ। নভেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে। ডিসেম্বরে আরও শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ বেড়ে মূল্যস্ফীতি পৌঁছায় ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে। খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ দশমিক ১০ শতাংশের ঘরে। গভর্নর আশা করেছিলেন, মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের নিচে নামলে কিছুটা শিথিলতার সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু বাস্তবে তা না হওয়ায় কড়াকড়ি বজায় রাখাকেই তিনি অনিবার্য মনে করছেন।
বর্তমান নীতির পেছনে রয়েছে দীর্ঘ একটি প্রেক্ষাপট। নতুন গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার সময় নীতি সুদহার ছিল ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে তিন দফায় ৫০ বেসিস পয়েন্ট করে বাড়িয়ে তা ১০ শতাংশে নেওয়া হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ব্যাংকঋণের সুদহারে। বর্তমানে গড় ঋণসুদ ১৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, যা বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
সিপিডির বিশেষ ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সংকোচনমূলক নীতির ফলে বিনিয়োগ কমেছে এবং কর্মসংস্থান থমকে আছে। তবে ইতিবাচক দিক হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে এবং ডলারের বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে। তাঁর মতে, মুদ্রানীতি একা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না; রাজস্ব নীতি, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও বাজার তদারকি একসঙ্গে এগোতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, মুদ্রানীতি প্রণয়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি কাঠামোগত প্রক্রিয়া রয়েছে। স্টেকহোল্ডারদের মতামত, বিভিন্ন সমীক্ষা ও অর্থনৈতিক সূচক বিশ্লেষণ করেই নীতি তৈরি করা হয়। সামনে জাতীয় নির্বাচন থাকলেও মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির পারস্পরিক সম্পর্ক বিবেচনায় রেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সিএ/এসএ


