রাফি পড়াশোনার জন্য টেবিলে বসেছে। ১০ মিনিটের মধ্যে সে বই রেখে মোবাইলে স্ক্রল করছে, আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলছে বইয়ের দিকে তাকিয়ে। আজকাল শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘পড়তে মন চাইছে না’—এ কথাটি খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু কেন পড়ার সময় মন বসে না? গবেষকরা বলছেন, এটি কোনো চরিত্রগত দুর্বলতা নয়, বরং মস্তিষ্কের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।
মস্তিষ্ক এবং অলসতার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের মস্তিষ্ক তিনটি প্রধান অংশের মাধ্যমে কাজের মোটিভেশন নিয়ন্ত্রণ করে—
প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স: পরিকল্পনা ও লক্ষ্য নির্ধারণ।
বেসাল গ্যাংলিয়া: কাজ শুরু করার ‘স্টার্ট বাটন’।
ডোপামিন নেটওয়ার্ক: উদ্যম ও আগ্রহ বজায় রাখে।
যখন এই তিনটি অংশ সমন্বিতভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হয়, তখন শিক্ষার্থী নিজেকে অলস মনে করে। বই পড়তে বসলেও মন বসে না, সহজ কাজও ভারী মনে হয়।
কেন মস্তিষ্ক কাজ এড়িয়ে যায়?
নিউরোসায়েন্স অনুসারে, মস্তিষ্ক প্রতিটি কাজের ক্ষেত্রে বিবেচনা করে—১. কাজ করতে কতটা মানসিক শক্তি প্রয়োজন, ২. কাজ করলে কী ধরনের ফল বা আনন্দ পাওয়া যাবে। যখন ফলাফলের মান কম মনে হয়, মস্তিষ্ক ‘সেফ মোডে’ চলে যায়।
প্রতি অংশের ভূমিকা:
বেসাল গ্যাংলিয়া: ধীর হলে কাজ শুরু করতে অনীহা হয়।
ডোপামিন: কম থাকলে আগ্রহ কমে যায়। সামাজিক মিডিয়া বা গেম দ্রুত ডোপামিন বাড়ায়, পড়াশোনা কম আকর্ষণীয় লাগে।
প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স: ঘুমের অভাব, চাপ বা স্ট্রেসে দুর্বল হয়ে যায়, কঠিন কাজ আরও কঠিন মনে হয়।
অলসতা বাড়ার পরিবেশগত ও মানসিক কারণ
শিক্ষার্থীরা আজকের তথ্য, ক্লাস, প্রতিযোগিতা ও পরীক্ষার চাপের মধ্যে বড় হচ্ছে। ব্যর্থতার ভয়, নিখুঁত হওয়ার প্রবণতা, অস্পষ্ট বা বড় লক্ষ্য—সবই মস্তিষ্ককে কাজ থেকে বিরত রাখে। কম আত্মবিশ্বাসও অলসতা বাড়ায়।
কৌশল: সেফ মোড নিয়ন্ত্রণে আনা
কাজকে ছোট অংশে ভাগ করা: প্রতিদিন ১৫–২০ মিনিট করে পড়া বা নোট তৈরি।
টু-ডু লিস্ট ও সংকেত ব্যবহার: অ্যালার্ম বা স্টিক নোট স্মরণ করিয়ে দেয়।
পোমোডোরো পদ্ধতি: ২৫ মিনিট পড়া, ৫ মিনিট বিরতি। ২ মিনিট রুল ব্যবহার করুন—কোনো কাজ দুই মিনিট শুরু করলে বাকিটা স্বাভাবিকভাবে হয়।
ঘুম, ব্যায়াম ও সুষম খাবার: পর্যাপ্ত ঘুম ও ব্যায়াম ডোপামিন ও এন্ডোরফিন বাড়ায়।
স্ক্রিন ও সামাজিক মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ: অতিরিক্ত ভিডিও ও গেম কমিয়ে পড়ার আগ্রহ বাড়ান।
নিজকে দোষারোপ বন্ধ করা: ‘আমি অলস’ না বলে বলুন, ‘আমার মোটিভেশন সিস্টেম শক্ত করতে হবে’।
অলসতা কোনো চরিত্রগত দুর্বলতা নয়; এটি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। ছোট পদক্ষেপে ধীরে ধীরে উদ্যম ফিরে আসে। আসল শক্তি আমাদের ভেতরেই আছে—মস্তিষ্ককে তার নিজস্ব ছন্দে একটু পথ দেখাতে হবে।
সিএ/এসএ


