Saturday, January 17, 2026
21 C
Dhaka

প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রব্যমূল্য নির্ধারণ করা কি জায়েজ?

বর্তমান সময়ে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অধিক মুনাফার লোভে পণ্য গুদামজাত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে। যখন দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক থাকে, তখন তারা সিন্ডিকেট গড়ে তুলে পণ্য বাজার থেকে সরিয়ে নেয়। এর ফলে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়ে। ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের মজুতদারি স্পষ্টভাবে নাজায়েজ ও হারাম হিসেবে বিবেচিত।

মহান আল্লাহ তায়ালা ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং ন্যায়সংগত ও উত্তম পন্থায় ব্যবসা পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে ব্যবসার নামে প্রতারণা, ক্ষতিকর আচরণ ও অন্যায়ের পথ অবলম্বন করতে নিষেধ করেছেন। পণ্য গুদামজাত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা সেই নিষিদ্ধ কাজগুলোর অন্যতম। এ বিষয়ে মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন।

ইসলামি শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রব্যমূল্য নির্ধারণ করা আবশ্যক নয়। বরং বাজারকে তার স্বাভাবিক গতিতে চলতে দেওয়াই উত্তম। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী কারিম (সা.)-এর যুগে একবার দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেলে সাহাবায়ে কেরাম অনুরোধ করেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাদের জন্য দ্রব্যমূল্য নির্ধারণ করে দিন।’ তখন তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা হলেন মূল্য নির্ধারক। তিনিই সংকীর্ণতা ও প্রশস্ততা আনয়নকারী এবং তিনিই রিজিক দানকারী। আমি আশা করি, আমি আমার রবের সঙ্গে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করব, যাতে তোমাদের কেউ জীবন বা সম্পদের ব্যাপারে আমার ওপর জুলুমের অভিযোগ তুলতে না পারে।’ (তিরমিজি, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ ও দারেমি)।

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, বিশেষ কোনো কারণ ছাড়া রাষ্ট্রীয়ভাবে দ্রব্যমূল্য নির্ধারণ করা সমীচীন নয়। তবে এর পাশাপাশি রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো, যেন কোনো অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড রোধে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি অপরিহার্য।

হাদিসে মজুতদারদের জন্য ভয়াবহ পরিণতির কথা বলা হয়েছে। নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আমদানিকারক রিজিকপ্রাপ্ত, আর মজুতদার অভিশপ্ত।’ (ইবনে মাজাহ)। অন্য হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি পণ্য গুদামজাত করে, সে বড় অপরাধী ও গুনাহগার।’ (মুসলিম)। হজরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মুসলমানদের খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত করবে, আল্লাহ তাকে কুষ্ঠরোগ অথবা দারিদ্র্যে আক্রান্ত করবেন।’ (ইবনে মাজাহ)।

এমনকি মজুত করা পণ্য পরে সদকা করলেও সেই গুনাহ মাফ হয় না। হজরত আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যদি কোনো ব্যক্তি ৪০ দিন খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত করে রাখার পর তা সদকা করে দেয়, তবুও এই সদকা তার গুনাহের কাফফারা হবে না।’ (রাজিন)।

অনেকে প্রশ্ন করেন, হজরত ইউসুফ (আ.) কেন খাদ্যশস্য সঞ্চয় করেছিলেন। ইসলামি ব্যাখ্যায় বলা হয়, এটি ছিল আল্লাহর নির্দেশে জনকল্যাণমূলক ব্যবস্থা। প্রথম সাত বছরের উদ্বৃত্ত শস্য জমা রেখে পরবর্তী সাত বছরের দুর্ভিক্ষে মানুষের জীবন রক্ষা করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। এটি ছিল কল্যাণমূলক সঞ্চয়, মুনাফার জন্য মজুতদারি নয়।

হজরত আবু লাইস (রহ.) তাঁর গ্রন্থ আল জামিউস সগীরে গুদামজাতকরণকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন—মাকরুহ, জায়েজ এবং নিষিদ্ধ। ইমাম নববী (রহ.)সহ অন্যান্য আলেমদের মতে, যেসব কারণে গুদামজাত করা নিষিদ্ধ, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম সংকট তৈরির উদ্দেশ্য, দাম বাড়লে আনন্দিত হওয়া ও কমলে চিন্তিত হওয়া এবং জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে অতিরিক্ত মুনাফার আশা করা।

বিশেষ করে কোনো অঞ্চলের প্রধান খাদ্যশস্য গুদামজাত করা মারাত্মক গুনাহ। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি মূল্যবৃদ্ধির আশায় ৪০ দিন খাদ্যদ্রব্য মজুত করে রাখবে, সে আল্লাহর দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে যাবে এবং আল্লাহও তার দায়িত্ব থেকে মুক্ত হবেন।’ (রাজিন)। এর অর্থ এই নয় যে, ৪০ দিনের কম মজুত করা বৈধ; বরং হারাম উদ্দেশ্যে একদিনের জন্যও মজুত করলেই তা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।

পরিশেষে বলা যায়, ইসলাম ন্যায়সংগত ব্যবসাকে উৎসাহিত করে এবং জনস্বার্থবিরোধী সব ধরনের কার্যকলাপকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। তাই ব্যবসায়ী সমাজের প্রতি আহ্বান—হালাল পথে ব্যবসা পরিচালনা করে সমাজ ও মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা হোক।

সিএ/এসএ

spot_img

আরও পড়ুন

খিটখিটে মেজাজ দূর করার সহজ উপায়

মেজাজ হারানো বা খিটখিটে থাকা আজকের ব্যস্ত জীবনে অনেকেরই...

ঢাকা থেকে একদিনে ঘুরে আসা যায়—মনোরম ৪টি জায়গা

রাজধানী ঢাকার কাছাকাছি এমন কিছু মনোরম জায়গা রয়েছে, যেখানে...

বাংলাদেশ-নেপাল ৮ম বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত

ঢাকায় বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে ৮ম বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের...

রাগ ছাড়াই সমালোচনা মোকাবিলা করার ৫টি কার্যকর উপায়

কেউ যখন বলে, “তুমি আরও ভালো করতে পারো,” তখন...

শাকসু নির্বাচন ২০ জানুয়ারি, ইসির অনুমোদন

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু)...

মুক্তির আগেই শীর্ষে শাহরুখের ‘কিং

ক্যারিয়ারের শেষভাগে এসেও ধারাবাহিক সাফল্যে ভক্তদের চমক দিয়ে চলেছেন...

রাবির ‘এ’ ইউনিট ভর্তি পরীক্ষায় উপস্থিতি ৯০ শতাংশের বেশি

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষের ১ম বর্ষ স্নাতক (সম্মান)...

মহাকাশে চীনা অভিযাত্রীদের সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি

মহাকাশ সব সময়ই মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে গিয়ে বিজ্ঞানীরা...

মন বসছে না পড়ার টেবিলে?

রাফি পড়াশোনার জন্য টেবিলে বসেছে। ১০ মিনিটের মধ্যে সে...

নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী ব্যাংকাররা ভোট দেবেন পোস্টাল ব্যালটে

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে দায়িত্ব পালনকারী...

এসএসসি পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা

আগামী ২১ এপ্রিল মঙ্গলবার থেকে শুরু হচ্ছে মাধ্যমিক স্কুল...

আইসিসির ভারতীয় বংশোদ্ভূত কর্মকর্তাকে ভিসা দিল না বাংলাদেশ

আইসিসি ও বিসিবির আলোচনার চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে আইসিসি বাংলাদেশে...

অশালীন ছবি তৈরি ও ছড়িয়ে দেয়ায় ইলন মাস্কের এক্সএআইর বিরুদ্ধে মামলা

মার্কিন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান এক্সএআইর...

অভিযান চালানোর আগেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হয় যুক্তরাষ্ট্রের

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করতে মার্কিন সামরিক অভিযান...
spot_img

আরও পড়ুন

খিটখিটে মেজাজ দূর করার সহজ উপায়

মেজাজ হারানো বা খিটখিটে থাকা আজকের ব্যস্ত জীবনে অনেকেরই সাধারণ সমস্যা। নানা কারণ—ঘুমের অভাব, মানসিক চাপ, শারীরিক অসুস্থতা বা উদ্বেগ—মেজাজের ওঠাপড়ার পেছনে কাজ করে।...

ঢাকা থেকে একদিনে ঘুরে আসা যায়—মনোরম ৪টি জায়গা

রাজধানী ঢাকার কাছাকাছি এমন কিছু মনোরম জায়গা রয়েছে, যেখানে একদিনের ছোট ভ্রমণে প্রকৃতি, ইতিহাস ও প্রশান্তির ছোঁয়া মিলবে। ভ্রমণপিপাসুদের জন্য সেরা এই চারটি গন্তব্যের...

বাংলাদেশ-নেপাল ৮ম বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত

ঢাকায় বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে ৮ম বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ১৩ ও ১৪ জানুয়ারি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত এই সভায় বাণিজ্য সচিব...

রাগ ছাড়াই সমালোচনা মোকাবিলা করার ৫টি কার্যকর উপায়

কেউ যখন বলে, “তুমি আরও ভালো করতে পারো,” তখন খারাপ লাগা স্বাভাবিক। তবে সমালোচনা যদি গঠনমূলকভাবে গ্রহণ করা যায়, তা নিজেকে উন্নত করার বড়...
spot_img