সূর্যই পৃথিবীর আলো ও তাপের প্রধান উৎস। পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণের অস্তিত্ব কোনো না কোনোভাবে সূর্যের ওপর নির্ভরশীল। তবুও সূর্যের আচরণ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন নিয়ে বিজ্ঞানীদের জানার পরিধি এখনও সীমিত। সাম্প্রতিক এক গবেষণা নাসার বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে সূর্যের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়ে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৮ সালের পর থেকে সূর্যের সামগ্রিক সক্রিয়তা প্রত্যাশার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর আগে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, সূর্য তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় শান্ত অবস্থায় থাকবে। কিন্তু বাস্তবে সেই পূর্বাভাসের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি। বরং সূর্য যেন ধীরে ধীরে দীর্ঘ ঘুম ভেঙে আবার সক্রিয় হয়ে উঠছে।
এই বাড়তি সক্রিয়তা কোনো দুর্যোগপূর্ণ সিনেমার দৃশ্যের মতো হঠাৎ পৃথিবীতে বিপর্যয় ডেকে আনবে—এমনটা নয়। সূর্য এখনই তেজস্ক্রিয়তা বর্ষণ করবে বা নিভে যাবে—এমন আশঙ্কাও নেই। তবে এই পরিবর্তনের কারণে মহাকাশ গবেষণা, স্যাটেলাইট পরিচালনা এবং ভবিষ্যৎ মহাকাশ মিশনের পরিকল্পনায় নতুন করে হিসাব-নিকাশ করতে হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, সূর্যের একটি পরিচিত ১১ বছরের চক্র রয়েছে। এই চক্র অনুযায়ী সূর্যের সক্রিয়তা কখনো বাড়ে, কখনো কমে। পাশাপাশি সূর্য দীর্ঘ সময় ধরে তুলনামূলক শান্ত বা কম সক্রিয় অবস্থায়ও থাকতে পারে। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ১৭ ও ১৯ শতকেও সূর্যের এমন দীর্ঘমেয়াদি শান্ত পর্ব লক্ষ্য করেছিলেন গবেষকেরা, যা কয়েক দশক স্থায়ী হয়েছিল।
১৯৯০ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে সূর্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সূচক বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেন, সূর্যের কার্যকলাপ তখন ধীরে ধীরে কমছিল। সেই সময় অনেকেই ধারণা করেছিলেন, সূর্য আবারও দীর্ঘ সময়ের জন্য শান্ত পর্যায়ে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণার ফল বলছে, বাস্তবে ঠিক তার উল্টোটা ঘটেছে।
২০০৮ সাল থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সূর্যের চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তি এবং সৌর বাতাসের তীব্রতা ধীরে ধীরে বেড়েছে। এই প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিত নন। বিষয়টি পর্যবেক্ষণে আধুনিক লেজার প্রযুক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।
সূর্যের সক্রিয়তা বেড়ে যাওয়ার একটি বড় ঝুঁকি হলো সৌরচ্ছ্বটা বা করোনাল মাস ইজেকশন বা সিএমই-এর সম্ভাবনা বৃদ্ধি। সিএমই হলো সূর্য থেকে ছিটকে আসা গ্যাসের বিশাল মেঘ, যা মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। বড় আকারের কোনো সিএমই যদি পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র অতিক্রম করে আঘাত হানে, তাহলে ভূ-চৌম্বকীয় ঝড় সৃষ্টি হতে পারে। এতে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, যোগাযোগ অবকাঠামো, জিপিএস স্যাটেলাইট এবং রেডিও যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটার ঝুঁকি থাকে।
এ ছাড়া মহাকাশে তীব্র বিকিরণ ছড়িয়ে পড়লে নভোচারীদের নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। যদিও এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্ভাবনা খুবই কম, তবুও সতর্কতার জন্য বিজ্ঞানীরা সূর্যের প্রতিটি পরিবর্তনের দিকে নিবিড়ভাবে নজর রাখছেন
সিএ/এমআর


