একটি আদর্শ মুসলিম পরিবারে যখন কোনো সন্তান ঘর ছেড়ে চলে যায়, তখন সেটি কেবল পারিবারিক সংকট নয়; বরং সামাজিক, মানসিক ও আত্মিক এক গভীর বিপর্যয়ের জন্ম দেয়। এমন পরিস্থিতিতে বাবা-মা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, পরিবারে উদ্বেগ ও লজ্জাবোধ তৈরি হয় এবং সমাজের চাপ আরও কঠিন হয়ে ওঠে। বর্তমান সময়ে অনেক ধর্মভীরু পরিবারও এই বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে। ফলে সম্মান রক্ষার মানসিকতা ও ইসলামের ধৈর্যশীল শিক্ষার মধ্যে এক ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়। এই অবস্থায় সঠিক পথ নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষজ্ঞ ও আলেমদের মতে, সন্তান ঘরছাড়া হওয়ার পেছনে সাধারণত দুটি চরমপন্থা কাজ করে। একদিকে অতিরিক্ত স্বাধীনতা ও নির্দেশনার অভাব, অন্যদিকে অতিরিক্ত কঠোরতা ও ভীতিকর পারিবারিক পরিবেশ। কোনো কোনো পরিবার পশ্চিমা জীবনধারার প্রভাবে সন্তানদের এমন অবাধ স্বাধীনতা দেয়, যেখানে ধর্মীয় ও নৈতিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে সন্তানরা ধীরে ধীরে শিকড় ভুলে বিপথে চলে যায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কঠোর শাসন, সবকিছু নিষেধের বেড়াজাল ও শাস্তির ভয় সন্তানদের মনে চাপ সৃষ্টি করে। স্কুল বা বন্ধুদের কাছে রঙিন জীবন দেখে তারা বাড়ির পরিবেশকে কারাগারের মতো মনে করে এবং সুযোগ পেলেই বেরিয়ে যেতে চায়।
ইসলাম এই দুই চরমতার মাঝামাঝি পথের শিক্ষা দেয়। সন্তানকে শুধু শাসনের মাধ্যমে নয়, ভালোবাসা, মমতা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে সঠিক-ভুলের পার্থক্য শেখাতে বলা হয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে, কেউ অন্য কারও বোঝা বহন করবে না। এতে বোঝা যায়, প্রত্যেক মানুষ নিজের কর্মের দায় নিজেই বহন করবে।
সন্তান ঘর ছেড়ে যাওয়ার পর অনেক বাবার কাছে সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় সামাজিক সম্মান বা ইজ্জতের প্রশ্ন। বিশেষ করে সমাজে পরিচিত বা ধর্মীয়ভাবে সম্মানিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই চাপ আরও তীব্র হয়। অনেক সময় এই সম্মান রক্ষার তাগিদে কেউ কেউ চরম ও সহিংস সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ভাবেন। তবে ইসলামি শরিয়তে নিজের হাতে শাস্তি তুলে নেওয়া সম্পূর্ণ হারাম এবং অগ্রহণযোগ্য।
কোরআনে হজরত নুহ (আ.)-এর কাহিনিতে দেখা যায়, তিনি আল্লাহর রাসুল হওয়া সত্ত্বেও তাঁর নিজের সন্তান অবাধ্য ছিল এবং কুফরির ওপর মৃত্যুবরণ করেছিল। তবুও আল্লাহ তাঁকে লাঞ্ছিত করেননি; বরং ধৈর্য ধারণের শিক্ষা দিয়েছেন। একইভাবে হজরত লুত (আ.)-এর পরিবারেও অবাধ্যতার উদাহরণ রয়েছে। এতে বোঝা যায়, সন্তানের ভুলের দায় বাবা-মায়ের ঈমান বা মর্যাদাকে আল্লাহর কাছে কমিয়ে দেয় না। সম্মান একমাত্র আল্লাহর হাতে।
ধৈর্য ও প্রজ্ঞাই এই সংকট মোকাবিলার মূল চাবিকাঠি। রাগের বশবর্তী হয়ে কোনো কঠোর সিদ্ধান্ত নিলে তা পরিবার ও সমাজ—দুটোকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। হাদিসে বলা হয়েছে, প্রকৃত বীর সে নয় যে শক্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং প্রকৃত বীর সেই ব্যক্তি, যে রাগের সময় নিজেকে সংযত রাখতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে করণীয় হিসেবে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেন। প্রথমত, হিদায়েত দেওয়ার মালিক যে একমাত্র আল্লাহ—এ বিশ্বাসকে দৃঢ় করা। দ্বিতীয়ত, সহিংসতা ও প্রতিশোধের পথ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা। আইনগত কোনো জটিলতা থাকলে তা আইনানুগ পদ্ধতিতেই সমাধান করতে হবে। তৃতীয়ত, সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগের পথ বন্ধ না করা। সে ফিরে আসতে চাইলে যেন পরিবারের দরজা খোলা থাকে—এই মানসিকতা ধরে রাখা জরুরি। তওবার সুযোগ আল্লাহ সবাইকে দেন। চতুর্থত, সমাজে সচেতনতা তৈরি করা, যাতে অভিভাবকেরা সন্তান লালন-পালনে অতিরিক্ত কঠোরতা বা অতিরিক্ত শিথিলতা—কোনোটিই না করেন।
একটি মুসলিম পরিবারের জন্য সন্তানের বিচ্যুতি নিঃসন্দেহে বড় কষ্টের। তবে এই কষ্ট যেন কখনো ইসলামের সীমা লঙ্ঘনের কারণ না হয়। আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা একজন মুমিনের অন্যতম গুণ। ধৈর্য, দোয়া ও সুন্নাহভিত্তিক আচরণের মাধ্যমেই এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে নিতে হবে।
সিএ/এমআর


