মিরাজ ইসলামের ইতিহাসে এক বিস্ময়কর ও অলৌকিক ঘটনা। এই মহিমান্বিত সফরে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিভিন্ন স্তরে ভিন্ন ভিন্ন বাহনে আরোহণ করেন। তবে মক্কা থেকে বায়তুল মোকাদ্দাস পর্যন্ত যাত্রার প্রধান বাহন ছিল বোরাক। বোরাক দেখতে কেমন ছিল—এ নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই কৌতূহল ও নানা জনশ্রুতি প্রচলিত রয়েছে। সমাজে প্রচলিত কিছু ছবিতে বোরাককে ঘোড়ার মতো দেহ, পাখা এবং নারীর আকৃতির মুখবিশিষ্ট হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু পবিত্র কোরআন ও সহিহ হাদিসে বোরাকের আকৃতি সম্পর্কে কী বলা হয়েছে, তা নিয়েই আলোচনার প্রয়োজন দেখা দেয়।
নির্ভরযোগ্য হাদিস অনুযায়ী, বোরাক ছিল একটি দীর্ঘদেহী চতুষ্পদ প্রাণী, যা গাধার চেয়ে বড় এবং খচ্চরের চেয়ে ছোট ছিল। সুনানে তিরমিজিতে উল্লেখ রয়েছে, এর গায়ের রং ছিল ধবধবে সাদা বা শুভ্র। বোরাকের গতি ছিল অত্যন্ত দ্রুত। বর্ণনায় এসেছে, বোরাকের দৃষ্টি যেখানে গিয়ে পৌঁছাত, তার পায়ের ক্ষুরও সেখানে গিয়ে পড়ত। অর্থাৎ চোখের পলকে এটি দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করতে সক্ষম ছিল। তাফসিরে তাবারির বর্ণনা অনুযায়ী, বোরাকের দুই ঊরুর ওপর দুটি ডানা ছিল, যা তাকে দ্রুতগতিতে চলতে সহায়তা করত।
সমাজে প্রচলিত মানবাকৃতি বা নারী চেহারার ধারণার কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সহিহ হাদিসে পাওয়া যায় না। বিশুদ্ধ কোনো বর্ণনায় বোরাককে মানুষের মতো বা নারীর আকৃতির বলা হয়নি। ইতিহাসবিদদের মতে, পারস্য ও দূরপ্রাচ্যের কিছু চিত্রকলায় কল্পনার আশ্রয়ে বোরাককে মানুষের মুখমণ্ডলসহ উপস্থাপন করা হয়েছে। ধারণা করা হয়, আরবি থেকে ফারসি ভাষায় অনুবাদের সময় ‘সুন্দর মুখমণ্ডল’ শব্দের ভুল ব্যাখ্যা থেকেই এই চিত্ররূপের জন্ম হয়েছে। পরে তা ভারতীয় উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। যদিও সালাবির একটি দুর্বল সূত্রে মানুষের চেহারার উল্লেখ পাওয়া যায়, তবে অধিকাংশ মুহাদ্দিস ও আলেম এই বর্ণনাকে গ্রহণযোগ্য মনে করেননি।
হাদিসে আরও এসেছে, নবীজি (সা.) যখন বোরাকের রেকাবে পা রাখতে উদ্যত হন, তখন বোরাক কিছুটা চঞ্চলতা প্রকাশ করে। তখন জিবরাইল (আ.) তাকে বলেন, ‘তুমি কি জানো তোমার ওপর আজ কে সওয়ার হচ্ছেন? আল্লাহর কাছে তাঁর চেয়ে প্রিয় কেউ কোনো দিন তোমার ওপর বসেনি।’ এই কথা শুনে বোরাক লজ্জা ও ভয়ে ঘর্মাক্ত হয়ে শান্ত হয়ে যায়। এই ঘটনা বোরাকের সম্মান ও মর্যাদার দিকটি স্পষ্ট করে।
বিশিষ্ট তাবেয়ি সায়িদ ইবনুল মুসাইয়িব (রা.)-এর মতে, বোরাক সেই জন্তু, যাতে আরোহণ করে হজরত ইবরাহিম (আ.) সিরিয়া থেকে মক্কায় তাঁর পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে দেখতে যেতেন। এ বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, বোরাক শুধু মিরাজের সময়ই নয়, এর আগেও আল্লাহর বিশেষ উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে।
আল্লামা মাহমুদ আলুসি (রহ.)-এর মতে, মিরাজ সফরে মোট পাঁচটি মাধ্যম ব্যবহৃত হয়েছিল। মক্কা থেকে বায়তুল মোকাদ্দাস পর্যন্ত বোরাক, বায়তুল মোকাদ্দাস থেকে প্রথম আসমান পর্যন্ত সিঁড়ি, প্রথম থেকে সপ্তম আসমান পর্যন্ত ফেরেশতাদের ডানা, সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত জিবরাইল (আ.)-এর ডানা এবং সিদরাতুল মুনতাহা থেকে আরশে আজিম পর্যন্ত রফরফ ব্যবহৃত হয়। এতে বোঝা যায়, মিরাজ ছিল বহুস্তর বিশিষ্ট এক অলৌকিক সফর।
সার্বিকভাবে বলা যায়, বোরাক ছিল মহান আল্লাহর এক বিশেষ সৃষ্টি, যার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল অতিপ্রাকৃত গতি ও উজ্জ্বল শুভ্রতা। নির্ভরযোগ্য ইসলামি দলিলে বোরাককে নারী বা মানবাকৃতির প্রাণী হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। প্রচলিত চিত্র ও কাহিনির সঙ্গে সহিহ হাদিসের বর্ণনার পার্থক্য স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়।
সিএ/এমআর


