মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়ে আবারও নিজের কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি দেখিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম এই দ্বীপটি দখলে প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আনতে তিনি ‘সহজ পথ’ অথবা ‘কঠিন পথ’—দুটোর যেকোনো একটি বেছে নিতে প্রস্তুত।
ওয়াশিংটনের এই অবস্থান ডেনমার্কসহ ইউরোপের মিত্র দেশগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। বিষয়টি এতটাই গুরুতর রূপ নিয়েছে যে, পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, কোনো ন্যাটো মিত্র রাষ্ট্রের অধীন ভূখণ্ড দখলের হুমকি জোটের অভ্যন্তরীণ ঐক্যকে বড় ধরনের সংকটে ফেলতে পারে।
আর্কটিক অঞ্চলে অবস্থিত গ্রিনল্যান্ড ভৌগোলিকভাবে উত্তর আমেরিকা মহাদেশের অংশ হলেও প্রায় ৩০০ বছর ধরে এটি ডেনমার্কের একটি আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। কৌশলগত অবস্থানের কারণে দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর আমেরিকা ও আর্কটিক অঞ্চলের মাঝামাঝি অবস্থান করায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শনাক্তকরণ, সামরিক নজরদারি এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ পর্যবেক্ষণে গ্রিনল্যান্ড বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ছাড়া বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে বরফ গলতে থাকায় গ্রিনল্যান্ডের ভূগর্ভে থাকা বিপুল খনিজ সম্পদ উত্তোলনের সম্ভাবনা বাড়ছে। বিরল মৃত্তিকা ধাতু, ইউরেনিয়াম ও তেলের মতো মূল্যবান সম্পদের কারণে দ্বীপটি বিশ্বশক্তিগুলোর নজর কাড়ছে। যদিও ট্রাম্পের দাবি, খনিজ সম্পদের চেয়েও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে গ্রিনল্যান্ড দখল করা জরুরি। তার আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে না এলে রাশিয়া বা চীন সেখানে প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য গ্রিনল্যান্ডের স্থানীয় নেতৃত্ব ও ডেনমার্ক সরকার সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন সতর্ক করে বলেছেন, কোনো ন্যাটো মিত্রের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এমন চাপ বা জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা ন্যাটোর অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে ফেলবে।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ডেনমার্কের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যসহ ন্যাটোর প্রভাবশালী সদস্যরা এক যৌথ অবস্থানে জানিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার কেবল সেখানকার জনগণ ও ডেনমার্কের। ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারো জানিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ডে একটি নতুন কনসুলেট খোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের চাপের বিপরীতে কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে, হোয়াইট হাউস গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান আরও দৃশ্যমান করছে। সম্প্রতি হোয়াইট হাউস থেকে প্রকাশিত একটি কার্টুন চিত্রে গ্রিনল্যান্ডকে কুকুরে টানা স্লেজের সঙ্গে তুলনা করে দুটি পথ দেখানো হয়—একদিকে উজ্জ্বল হোয়াইট হাউস, অন্যদিকে অশান্ত রাশিয়া ও চীনের প্রতীকী দৃশ্য। এই উপস্থাপনাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
বর্তমানে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের প্রতিনিধিদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসেছেন। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, তারা গ্রিনল্যান্ড কিনতে আগ্রহী, জোরপূর্বক দখল করতে নয়। তবে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও অতীত অভিজ্ঞতার কারণে ইউরোপীয় দেশগুলো ওয়াশিংটনের আশ্বাসে পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছে না।
গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেন ট্রাম্পের পরিকল্পনাকে সম্পূর্ণ অবাস্তব বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয় এবং কোনো অবস্থাতেই তারা যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে চায় না।
এ পরিস্থিতিতে গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুউকসহ বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। ডেনমার্কের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও মার্কিন তৎপরতাকে জাতীয় নিরাপত্তার সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে মূল্যায়ন করছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যেই গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে ট্রাম্পের এই নতুন অবস্থান বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সূত্র: বিবিসি
সিএ/এসএ


