ইসলাম পৃথিবীর সহজতম ধর্ম। তবে ব্যক্তিগত অশিক্ষা, অপশিক্ষা, অর্ধশিক্ষা, ভুল ব্যাখ্যা এবং রাজনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় অনেকেই ইসলামকে কঠিন ও জটিল হিসেবে উপস্থাপন করছেন। এতে সাধারণ মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে এবং ধর্মের মূল সহজ পথ থেকে মানুষ দূরে সরে যাচ্ছে বলে মত দেন সংশ্লিষ্টরা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘…তোমাদের অন্তর কঠিন হয়ে গেছে, তা তো পাথরের মতো অথবা তার চেয়েও কঠিন…।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৭৪)
পবিত্র কোরআনে বারবার দ্বিনকে সহজ করে উপস্থাপনের কথা বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি কোরআনকে উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ করে দিয়েছি। অতএব, উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি?’ (সুরা : কামার, আয়াত : ১৭)
ধর্মীয় পরিভাষা ও আচরণে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা সৃষ্টি করাকেও বড় সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কোথাও বলা হচ্ছে ‘অকালমৃত্যু’, আবার কোথাও বলা হচ্ছে ‘মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়া’, যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করেন আলেমরা। একইভাবে ‘বিসমিল্লাহ’-কে বিকৃতভাবে উপস্থাপন বা নতুন বিভ্রান্তিকর শব্দচয়ন, মাজার, ফতোয়া ও জিহাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষার অপপ্রয়োগও বিভ্রান্তি বাড়াচ্ছে।
ধর্মীয় আচরণ ও আমলে নানা বিষয়ে মতভেদকেও অযথা বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে বলে মত দেন সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে রয়েছে চিঠিপত্রে ‘আসসালামু আলাইকুম’-এর পরিবর্তে ভিন্ন শব্দ ব্যবহার, তারাবির নামাজের রাকাত সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক, নামাজের পর মোনাজাত করা বা না করা, মিলাদ ও দরুদ পাঠ নিয়ে মতভেদ, একই দিনে ঈদ বা রোজা হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং কোরবানির বিধান নিয়ে নানা তত্ত্বকথা। এমনকি কেউ কেউ মাজহাবের প্রয়োজনীয়তাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছেন।
ইসলামের মূলনীতি হলো সহজতা ও মধ্যপন্থা। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের পক্ষে যা সহজ আল্লাহ তা-ই চান এবং তোমাদের পক্ষে যা কষ্টকর তা তিনি চান না…।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৫) আরও বলা হয়েছে, ‘আমি তোমার ওপর কোরআন এ জন্য নাজিল করিনি যে তুমি দুঃখ-কষ্ট ভোগ করবে।’ (সুরা : ত্বহা, আয়াত : ১-২) এবং ‘তিনি (আল্লাহ) দ্বিনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো কঠোরতা আরোপ করেননি।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৭৮)
সঠিক উপলব্ধির অভাবে অনেকেই বিভ্রান্তিতে পড়ে এবং অন্যদেরও বিভ্রান্ত করে বলে উল্লেখ করা হয়েছে কোরআনে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘একদল লোককে তিনি সঠিক পথ দেখিয়েছেন, আর দ্বিতীয় দলটির ওপর গোমরাহি ও বিদ্রোহ ভালোভাবেই চেপে বসেছে; এরাই আল্লাহকে বাদ দিয়ে শয়তানদের নিজেদের অভিভাবক বানিয়ে নিয়েছে, তবু তারা নিজেদের সৎপথপ্রাপ্ত মনে করে।’ (সুরা : আল আরাফ, আয়াত : ৩০)
হাদিসে প্রিয় নবী (সা.) দ্বিনের সহজতা ও ভারসাম্যের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, দ্বিন অত্যন্ত সহজ ও সরল, কিন্তু যে ব্যক্তি দ্বিনের সঙ্গে বাড়াবাড়ি করবে সে পরাজিত হবে। (বুখারি) আবদুল্লাহ ইবন আমর (রা.)-কে উপদেশ দিয়ে তিনি বলেন, নিয়মিত রোজা ও সারারাত ইবাদতে অতিরিক্ত কষ্ট না করে শরীর, পরিবার ও অতিথির হক আদায় করার কথাও স্মরণ করিয়ে দেন। (বুখারি)
আরেক হাদিসে মহানবী (সা.) বলেন, অযথা কঠোরতা অবলম্বনকারীরা ধ্বংস হয়ে গেছে—এ কথা তিনি তিনবার বলেন। (মুসলিম) একই সঙ্গে মানুষকে দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশের পথ অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমার রবের পথে প্রজ্ঞার সঙ্গে এবং উত্তম উপদেশের মাধ্যমে মানুষকে আহ্বান করো।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ১২৫)
ইসলামে ঐক্য ও সংহতিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোরআনে মুসলিম সমাজকে ‘বুনিয়ানুম মারসুস’ বা সিসা ঢালা প্রাচীরের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়তার সঙ্গে ধারণ করো, তোমরা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যেয়ো না।’ (সুরা : আলে-ইমরান, আয়াত : ১০৩)
হাদিসে নবী (সা.) বলেন, সহজ করো, কঠিন কোরো না; সুসংবাদ দাও, ভয় দেখিয়ে দূরে সরিয়ে দিও না। (বুখারি) তিনি আরও বলেন, দলগত জীবন, নেতৃত্ব মানা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। (ভাবানুবাদ : তিরমিজি)
সব মিলিয়ে ইসলাম মানুষের জন্য কল্যাণ, শান্তি ও সহজতার পথ দেখায়। ব্যক্তিগত স্বার্থ, দলাদলি ও অযথা কঠোরতার মাধ্যমে সেই সহজ পথকে কঠিন করে তোলা ইসলামের শিক্ষা নয় বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
সিএ/এমআর


