প্রকৃতির নির্জন নিস্তব্ধতায়, রাতের আকাশে অগণিত নক্ষত্র মিটমিট করে জ্বলে ওঠার সময় বা দিনের কর্মব্যস্ততায় যখন জীবন দ্রুতবেগে ছুটে চলে, তখন প্রতিটি মানুষের মনে একটি গভীর প্রশ্ন জন্মায়—এই মহাবিশ্বের অর্থ কী? আমাদের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য কী, আমরা কেন এখানে এসেছি? এই বিশাল আকাশ, উত্তাল সমুদ্র এবং অটল পর্বতগুলো কি নিছকই দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে কোনো মহান স্রষ্টা কাজ করছেন?
মানুষের অবচেতন মনে আল্লাহর ধারণা সহজাতভাবে বিদ্যমান। এমনকি যারা ধর্মের অনুসারী নয়, বিপদ বা শোকের মুহূর্তে তারা আকাশের দিকে তাকিয়ে এক অদৃশ্য সত্তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। যুগে যুগে মানুষ প্রশ্ন করেছে—আল্লাহ কোথায় আছেন? তিনি কি আমাদের কাছে, নাকি দূরে? প্রকৃতির অংশ নাকি তার অতীত কোনো সত্তা? প্রাচীন ব্যাবিলনীয় ও মিশরীয়রা আল্লাহকে খুঁজতে বিশাল মিনার ও পিরামিড তৈরি করেছিল। পারস্যের লোকেরা আগুনের মধ্যে খুঁজেছিল। উত্তর আমেরিকার আদিবাসী বা কেল্টিকরা প্রকৃতির বিশালতায় আল্লাহর অস্তিত্ব কল্পনা করেছিল।
ইসলামের শিক্ষায় আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিজগতের ঊর্ধ্বে আসমানে অবস্থান করেন। তবে তিনি তাঁর জ্ঞান ও ক্ষমতার মাধ্যমে প্রতিটি সৃষ্টির সঙ্গেই আছেন। কোরআনে উল্লেখ আছে, “পরম করুণাময় আরশের উপর সমাসীন হয়েছেন।” (সুরা তাহা, আয়াত: ৫) অর্থাৎ আল্লাহ সব সৃষ্টির ঊর্ধ্বে এবং সকল সৃষ্টির সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ নন।
বিদায় হজের ভাষণে রাসুল (সা.) সাহাবিদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, “আমি কি পৌঁছে দিয়েছি?” সাহাবিরা উত্তর দিল, “হ্যাঁ,” তখন তিনি আকাশের দিকে আঙুল তুলে তিনবার বললেন, “হে আল্লাহ, তুমি সাক্ষী থাকো।” এটি স্পষ্ট করে যে আল্লাহ আসমানে আছেন এবং সমস্ত সৃষ্টি তাঁর জ্ঞান ও ক্ষমতার আওতায়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৭৩৯)
কোরআনে আরও বলা হয়েছে, “তিনিই সেই সত্তা যিনি আসমানসমূহ ও জমিনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি আরশের উপর সমাসীন হয়েছেন। তিনি জানেন যা জমিনে প্রবেশ করে এবং যা তা থেকে বের হয়, আর যা আসমান থেকে নামে এবং যা তাতে আরোহণ করে। আর তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, তিনি তোমাদের সঙ্গেই আছেন। আর তোমরা যা করো আল্লাহ তা সম্যক দ্রষ্টা।” (সুরা হাদিদ, আয়াত: ৪)
অনেকে এই ‘সঙ্গে থাকা’ শব্দটিকে ভুল বোঝেন। ইসলামের মূল শিক্ষা হলো, আল্লাহ মানুষের সঙ্গে আছেন তাঁর জ্ঞান, শ্রবণ ও দর্শনের মাধ্যমে। তিনি আরশের উপরে থেকেও আমাদের অন্তরের গোপনতম ইচ্ছার খবর রাখেন। কোরআনে বলা হয়েছে, “আর আমার বান্দারা যখন আপনার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, আমি তো তাদের খুব কাছেই আছি। আমি প্রার্থনাকারীদের ডাকে সাড়া দিই যখন সে আমাকে ডাকে।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৬) এছাড়া বলা হয়েছে, “আমি মানুষের ঘাড়ের রগ থেকেও তার বেশি নিকটবর্তী।” (সুরা ক্বাফ, আয়াত: ১৬)
এই নৈকট্য আধ্যাত্মিক এবং জ্ঞানগত। আল্লাহ তাঁর ক্ষমতার মাধ্যমে প্রতিটি অণু-পরমাণুর খবর রাখেন। মুমিন শোক বা বিপদে নিমজ্জিত হলে প্রশ্ন করে না ‘আল্লাহ কোথায় ছিলেন?’, কারণ সে জানে আল্লাহ তাঁর আরশের উপরে থেকে সব দেখছেন এবং ধৈর্যশীলদের জন্য মহাপুরস্কার প্রস্তুত রেখেছেন।
রাতের নিস্তব্ধতায় কিংবা দিনের কোলাহলে যখন আমরা বিচলিত বোধ করি, আকাশের দিকে তাকিয়ে বুঝতে হবে—আমার রব উপরে আছেন এবং সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন। এই পরম নির্ভরতাই মানুষকে প্রকৃত মুক্তি ও শান্তি দিতে পারে।
সিএ/এমআর


