শীত মৌসুমে শিশুদের মধ্যে সর্দি-কাশি ও বুকে কফ জমার সমস্যা বেশি দেখা যায়। অনেক পরিবারেই এ সময় শর্ষের তেল গরম করে শিশুর বুকে মালিশ করার প্রচলন রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পদ্ধতি শিশুর জন্য নিরাপদ নাও হতে পারে এবং এতে শ্বাসতন্ত্রের ক্ষতির ঝুঁকি থাকে। মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শিশুবিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক ডা. তাসনুভা খানের মতে, শর্ষের তেল ছোট শিশুর কোমল ত্বকের জন্য উপযোগী নয়।
শর্ষের তেল স্বভাবগতভাবেই ঝাঁজালো। ছোট শিশুর ত্বক অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় এই তেল ব্যবহারে ত্বকে জ্বালা, অস্বস্তি ও অ্যালার্জির মতো সমস্যা হতে পারে। পাশাপাশি তেল গরম করলে তার ক্ষুদ্র কণা বাতাসে ছড়িয়ে শ্বাসের সঙ্গে শিশুর শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করতে পারে, যা শ্বাসনালিতে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। শর্ষের তেলে বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান বা ভেজাল মেশানো থাকলে ক্ষতির আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়।
অনেক সময় গরম তেল মালিশের পর শিশুকে খালি গায়ে রোদে শুইয়ে রাখার প্রবণতাও দেখা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি মোটেও নিরাপদ নয়। শীতের বাতাসে শিশুর ঠান্ডা আরও বাড়তে পারে এবং শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই বুকে কফ জমলে শর্ষের তেল ব্যবহার না করে নিরাপদ ও চিকিৎসাসম্মত পদ্ধতিতে যত্ন নেওয়াই ভালো।
ঘরোয়া যত্ন হিসেবে শিশুকে পর্যাপ্ত তরল খাবার দিতে হবে। তরল খাবার কফ পাতলা করতে সাহায্য করে, ফলে কফ সহজে বের হয়ে আসে। ছয় মাস পার হওয়া শিশুকে উষ্ণ পানীয় দেওয়া যেতে পারে। আদার রস, তুলসীপাতা ও মধু উপকার দিতে পারে, তবে এক বছরের কম বয়সী শিশুকে মধু দেওয়া যাবে না।

শিশুকে গরম পানির ভাপ নিতে দেওয়া যেতে পারে, এতে শ্বাসনালির অস্বস্তি কমে এবং কফ নরম হয়। তবে ভাপ দেওয়ার সময় খুব সতর্ক থাকতে হবে, যেন গরম পানি থেকে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে। প্রয়োজনে ঘরে হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করা যেতে পারে, যা বাতাসে আর্দ্রতা বাড়িয়ে শ্বাস নিতে আরাম দেয়।
শিশুর বুকে ও পিঠে দিনে তিনবার ১৫ থেকে ২০ মিনিট গরম কাপড় দিয়ে সেঁক দেওয়া যেতে পারে। তবে সেঁক দেওয়ার সময় শিশুকে খালি গায়ে রাখা যাবে না, শীতের উপযোগী কাপড় দিয়ে শরীর ঢেকে রাখতে হবে। নাক বন্ধ থাকলে নরমাল স্যালাইন ড্রপ ব্যবহার করা যেতে পারে, যা ফার্মেসিতে শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ সোডিয়াম ক্লোরাইড দ্রবণ হিসেবে পাওয়া যায়।
সমস্যা হালকা হলে কয়েক দিনের মধ্যেই ঘরোয়া যত্নে উপশম হতে পারে। তবে কয়েক দিনের মধ্যে অবস্থার উন্নতি না হলে অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। কিছু লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা জরুরি। যেমন কফের রং গাঢ় হলুদ, সবুজ বা লালচে হওয়া, উচ্চমাত্রার জ্বর, শ্বাসকষ্ট বা ঘন ঘন শ্বাস নেওয়া, শ্বাসপ্রশ্বাসের সময় অস্বাভাবিক শব্দ হওয়া বা বুকের নিচের অংশ দেবে যাওয়া, কাশতে কাশতে বারবার বমি হওয়া, বুকে ব্যথা, অতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে পড়া, স্বাভাবিক চাঞ্চল্য কমে যাওয়া, অতিরিক্ত খিটখিটে আচরণ, তরল খাবার গিলতে না পারা, আঙুল বা ঠোঁট নীলচে হয়ে যাওয়া এবং ছোট শিশুর ক্ষেত্রে প্রতিটি শ্বাসের সঙ্গে নাক ফুলে ওঠা।

চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টিহিস্টামিনসহ অন্যান্য ওষুধ দিতে পারেন। শিশুদের ক্ষেত্রে সঠিক ডোজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাই নিজে থেকে ওষুধ দেওয়া উচিত নয়। কিছু ক্ষেত্রে বুকে জমে থাকা কফ বের করার জন্য চেস্ট ফিজিওথেরাপির পরামর্শ দেওয়া হতে পারে, যা শিখে নিয়ে বাড়িতেও করা সম্ভব।
সিএ/এমআর


