Thursday, January 1, 2026
22 C
Dhaka

মৃত্যুর দায় থেকে শেখ হাসিনা কখনো মুক্তি পাবেন না : নজরুল ইসলাম খান

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দায় থেকে ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা কখনো মুক্তি পাবেন না বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া দেশ-বিদেশের কোনো অপশক্তির কাছে কখনো মাথা নত করেননি। যারা তাঁকে জেলে পাঠিয়েছে, যারা তাঁকে গৃহহীন করেছে, তারাই শেষ পর্যন্ত পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে বেগম খালেদা জিয়ার নামাজে জানাজার আগে তিনি এসব কথা বলেন।

নজরুল ইসলাম খান বলেন, ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার শিকার হয়ে মিথ্যা মামলায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে দুই বছরের বেশি সময় অন্ধকার কারাগারে বন্দি ছিলেন খালেদা জিয়া। সে সময় উপযুক্ত চিকিৎসা না পাওয়ায় তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। পুরো দেশবাসী জানে, পায়ে হেঁটে তিনি কারাগারে প্রবেশ করেছিলেন। কিন্তু বেরিয়ে আসেন চরম অসুস্থ শরীর নিয়ে। দেশি-বিদেশি চিকিৎসকদের মতে, পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ চার বছর গৃহবন্দি অবস্থায় তাঁকে বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ না দেওয়ায় তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে।

তিনি বলেন, এসব ঘটনার ফলেই অবশেষে মৃত্যুর কাছে হার মানতে হয়েছে এই অপরাজেয় নেত্রীকে। তাই এ মৃত্যুর দায় থেকে শেখ হাসিনা কখনো মুক্তি পাবেন না। খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং দেশের স্বার্থে তাঁর অনমনীয় অবস্থানের কারণে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ প্রতিপক্ষ তাঁকে ব্যক্তিগত শত্রুতে পরিণত করেছিল বলেও উল্লেখ করেন নজরুল ইসলাম খান।

নজরুল ইসলাম খান বলেন, স্বৈরাচার শেখ হাসিনা, স্বৈরাচার হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এমনকি তথাকথিত এক-এগারোর সময়ও দেশনেত্রীকে কারাবন্দি করা হয়েছে। শুধু প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য তাঁকে তাঁর শহীদ স্বামীর স্মৃতিবিজড়িত বাসা থেকে উৎখাত করা হয় এবং মিথ্যা মামলায় দীর্ঘ ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবুও তিনি আধিপত্যবাদী অপরাজনীতির সঙ্গে কখনো আপস করেননি। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কিংবা ভোটাধিকারের প্রশ্নেও তিনি ছিলেন আপসহীন।

তিনি আরও বলেন, ‘আজ দেশনেত্রী সব অভিযোগ থেকে মুক্ত হয়ে লাখো-কোটি মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে জানাজায় আমাদের সামনে শায়িত। আর যারা তাঁকে জেলে পাঠিয়েছিল, যারা তাঁকে গৃহহীন করেছিল, তারা আজ রান্না করা খাবার খেতে পারেনি, পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। মাথার ওপর তাদের ঝুলছে মৃত্যু পরোয়ানা। এরশাদকে ভোগ করতে হয়েছে দীর্ঘ কারাবাস, এক-এগারোর প্রধান ব্যক্তিরাও দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন।’

নজরুল ইসলাম খান বলেন, ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি দল ও নেতাকর্মীদের মনোবল অটুট রাখতে খালেদা জিয়া বিএনপির সদস্যপদ গ্রহণ করেন। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ ও সংগ্রামী রাজনৈতিক পথচলা। দলের প্রতিষ্ঠাতার স্ত্রী হয়েও তিনি সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রেখে ভাইস চেয়ারম্যান, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং পরবর্তীতে কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্বাচিত চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনের ৪১ বছরই তিনি বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে থেকে দলকে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করেছেন।

তিনি বলেন, দীর্ঘ নয় বছর স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মাধ্যমে ১৯৯১ সালে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে বিএনপিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরিয়ে আনেন খালেদা জিয়া। এ সময় জাতি তাঁকে দেয় ‘আপসহীন দেশনেত্রী’র স্বীকৃতি। দেশ ও জনগণের স্বার্থে তিনি দেশ-বিদেশের কোনো অপশক্তির কাছে কখনো মাথা নত করেননি। কোনো প্রলোভন, ষড়যন্ত্র কিংবা হুমকি তাঁকে আপসের পথে নিতে পারেনি।

নজরুল ইসলাম খান বলেন, খালেদা জিয়া বলতেন, বিদেশে আমাদের বন্ধু আছে, প্রভু নেই। তাঁর নেতৃত্বে নেওয়া বিভিন্ন যুগান্তকারী কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশ উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যায়। তাঁর সময়েই বাংলাদেশ ‘ইমার্জিং টাইগার’ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পায়।

তিনি বলেন, জনগণের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে খালেদা জিয়া তিনবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। প্রতিটি নির্বাচনে তিনি যতগুলো আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পেয়েছেন, সব কটিতেই বিজয়ী হয়েছেন। ২০০৮ সালেও তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সব কটিতে জয় পান। এমন জনপ্রিয়তা শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্ব রাজনীতিতেও বিরল। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী।

নজরুল ইসলাম খান বলেন, গণতন্ত্রের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তিনি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন। ক্ষমতায় গিয়ে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে উদ্যোগ নেওয়ায় দেশ-বিদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষ তাঁকে ‘গণতন্ত্রের মাতা’ বলে সম্মানিত করেছেন। নারী শিক্ষায় উপবৃত্তি, শিক্ষার জন্য খাদ্য কর্মসূচি, মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবাসী কল্যাণে পৃথক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা ছিল তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান।

তিনি আরও বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ২ জুলাই থেকে বিজয় অর্জন পর্যন্ত খালেদা জিয়া তাঁর দুই শিশুপুত্রসহ পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্দি ছিলেন। স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর ও ফোর্স কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় তাঁর পরিবারকেও এই নির্মমতার শিকার হতে হয়। মুক্তিযুদ্ধে এই পরিবারের অবদান ইতিহাসে অনন্য।

নজরুল ইসলাম খান বলেন, দলমত নির্বিশেষে সমগ্র জাতির শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দোয়ার মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়া বিদায় নিচ্ছেন। তিনি রেখে গেলেন এক মহীয়সী নারী, এক সংগ্রামী রাজনীতিবিদ ও এক দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনায়কের অনন্য কর্মজীবনের উদাহরণ। তিনি বলতেন, দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই, বাংলাদেশই আমার ঠিকানা। এই দেশের মাটিতেই তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন এবং শহীদ স্বামীর পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হচ্ছেন।

সমাপনী বক্তব্যে নজরুল ইসলাম খান প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধান এবং জানাজা ও দাফনে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত সশস্ত্র বাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও র‌্যাবের সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

সিএ/এএ

spot_img

আরও পড়ুন

জোহরান মামদানি ইতিহাস গড়ছেন শপথে

আজ বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) জোহরান মামদানি নিউইয়র্ক সিটির মেয়র...

দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় চলছে অস্থিরতার মহামারি

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা বর্তমানে মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। জুলাই আন্দোলনে...

সামরিক সংঘাতের পর প্রথম সরাসরি যোগাযোগ

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি...

শিরোপাহীন মৌসুমেও গর্বিত সিটি কোচ

শিরোপা জিততে না পারলেও ২০২৫ সালকে ম্যানচেস্টার সিটিতে নিজের...

রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দেশনেত্রীর শেষ বিদায়

দলমতনির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের অশ্রুসিক্ত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় চিরনিদ্রায় শায়িত...

দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর গ্রেপ্তারের ঘটনা

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় একটি হত্যা মামলায় আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত এক পলাতক...

জানুয়ারিতে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম কমল

দেশের বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম কমানো হয়েছে।...

ছাত্রীনিবাসে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছিল রাবি শিক্ষার্থী

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) এক শিক্ষার্থীর নিথর দেহ উদ্ধার করা...

শীতকালে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে প্রয়োজন সচেতনতা

শীতের মৌসুমে নারীদের শরীরে নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তন...

নববর্ষের ভাষণে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পুতিনের

নববর্ষ উপলক্ষে দেওয়া ভাষণে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন,...

মধ্যপ্রাচ্যে নিষেধাজ্ঞায় বড় ধাক্কা ‘ধুরন্ধর’-এর ব্যবসায়

মুক্তির পর থেকেই বক্স অফিসে দাপট দেখাচ্ছে রণবীর সিং...

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে পাকিস্তানের স্পিকার আয়াজ সাদিকের সাক্ষাৎ

পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক অন্তর্বর্তী সরকারের...

কেন সবাই একসঙ্গে ইংরেজি নববর্ষ পালন করে না

ইংরেজি নববর্ষের সময় মধ্যরাতে ঘড়ির কাঁটা বারোটায় পৌঁছানোর সঙ্গে...

ইতিহাসের এক শোকাবহ জনসমাবেশের সাক্ষী ঢাকা

আপসের বদলে যিনি সংগ্রামকেই জীবনের ব্রত হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।...
spot_img

আরও পড়ুন

জোহরান মামদানি ইতিহাস গড়ছেন শপথে

আজ বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) জোহরান মামদানি নিউইয়র্ক সিটির মেয়র হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য অনুযায়ী, তিনি পবিত্র কোরআনের ওপর হাত রেখে শপথ নেবেন।...

দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় চলছে অস্থিরতার মহামারি

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা বর্তমানে মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে দেশকে স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত করার জন্য রক্তস্বাক্ষর দিয়েছেন। জাতি চিরদিন...

সামরিক সংঘাতের পর প্রথম সরাসরি যোগাযোগ

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় এসে সাক্ষাৎ করেছে দক্ষিণ এশিয়ার দুই বৈরী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের...

শিরোপাহীন মৌসুমেও গর্বিত সিটি কোচ

শিরোপা জিততে না পারলেও ২০২৫ সালকে ম্যানচেস্টার সিটিতে নিজের অন্যতম সেরা বছর হিসেবে দেখছেন কোচ পেপ গার্দিওলা। চোট-আঘাতে জর্জরিত একটি কঠিন মৌসুম পার করেও...
spot_img