মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের ব্যয় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর চাপানোর পরিকল্পনা করছেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছে হোয়াইট হাউস। ধারণা করা হচ্ছে, এই যুদ্ধের মোট ব্যয় কয়েক হাজার কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে।
গত সোমবার হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোকে এই যুদ্ধের ব্যয় বহনে আহ্বান জানাতে পারেন। ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়ের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটি এমন একটি বিষয়, যার জন্য প্রেসিডেন্ট যথেষ্ট আগ্রহী। তিনি তাদের আহ্বান জানাতে চাইবেন।’
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রভাবেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসন শুরু করেছে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। এখন এই সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে যুক্ত করা এবং যুদ্ধের ব্যয় ভাগ করে নেওয়ার বিষয়টি সামনে আনছে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে আরব বিশ্বের নেতারা এ বিষয়ে এখনো প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি লেভিট আরও বলেন, ‘আমি তাঁর সামনে থেকে এটি বলব না। তবে এটি নিঃসন্দেহে একটি ধারণা, যা তিনি ভাবছেন এবং আমি মনে করি, আপনি এটি তাঁর কাছ থেকে আরও শুনবেন।’
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ১৯৯০ সালে কুয়েতকে ইরাকের দখলদারত্ব থেকে মুক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোট উপসাগরীয় যুদ্ধ পরিচালনা করেছিল। সে সময় জার্মানি, জাপানসহ কয়েকটি দেশ প্রায় ৫ হাজার ৪০০ কোটি ডলার ব্যয় বহন করেছিল, যার বর্তমান মূল্য প্রায় ১৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের সমান। তবে এবার ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একতরফাভাবে অভিযান শুরু করেছে।
চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ডানপন্থী সমালোচক শন হ্যানিটি মন্তব্য করেন, সম্ভাব্য কোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে ইরানকে এই যুদ্ধের খরচ বহন করতে বাধ্য করা উচিত। তিনি বলেন, তাদের অবশ্যই পুরো সামরিক অভিযানের খরচ যুক্তরাষ্ট্রকে তেল দিয়ে পরিশোধ করতে হবে।
তবে ইরান বলেছে, যুদ্ধের ফলে তাদের যে ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ যুক্তরাষ্ট্রকেই দিতে হবে। সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির শর্তে বিষয়টি তারা অন্তর্ভুক্ত করেছে বলেও জানিয়েছে তেহরান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে।
ইরানের দাবি, তারা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের অভিযোগ, এসব হামলায় বেসামরিক স্থাপনা, হোটেল, বিমানবন্দর এবং জ্বালানি অবকাঠামোও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা কংগ্রেসের গোপন এক শুনানিতে জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরুর প্রথম ছয় দিনেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৩০ কোটি ডলার। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) হিসাব অনুযায়ী, দ্বাদশ দিনে এই ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৬৫০ কোটি ডলার। বর্তমানে যুদ্ধের সময়কাল ৩২ দিনে গড়িয়েছে, ফলে মোট ব্যয় আরও অনেক বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের কাছে অতিরিক্ত ২০ হাজার কোটি ডলারের সামরিক বাজেট চেয়েছে হোয়াইট হাউস।
সংঘাতের প্রভাবে ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়তে শুরু করেছে। আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের ট্র্যাকার অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় মূল্য এখন প্রায় ৪ ডলার, যা যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় এক ডলারের বেশি বেশি।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের মতে, জ্বালানির দামের এই উত্থান সাময়িক। প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, ‘স্বল্পমেয়াদি দাম ওঠানামা হলেও দীর্ঘ মেয়াদে ইরানকে দুর্বল করা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য লাভজনক হবে।’
অন্যদিকে ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেই তারা প্রথমে হামলার শিকার হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র বা অঞ্চলের জন্য তারা কোনো হুমকি ছিল না।
সিএ/এমই


