ইরানের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে অস্থির করে তুলেছে। এমন প্রেক্ষাপটে বুধবার (৮ এপ্রিল) যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় ডলারের আধিপত্য নিয়ে পুরোনো বিতর্ক নতুন করে সামনে এনেছে চীন ও ইরান।
ইরান ও চীনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে মার্কিন ডলারের একক আধিপত্য বা ‘ডলার হেজেমনি’র অবসান হওয়া উচিত। দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের প্রাধান্যকে কাজে লাগিয়ে তারা প্রতিপক্ষ দেশগুলোর ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে আসছে।
২০২৩ সালে জেপি মর্গান চেজের একটি হিসাব অনুযায়ী, বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ এখনো ডলারে নিষ্পত্তি হয়। এটি বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় ডলারের শক্ত অবস্থানকে স্পষ্ট করে।
হরমুজ প্রণালী ও ইউয়ান ব্যবহারের কৌশল
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালী, যার মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। এই কৌশলগত অবস্থান কাজে লাগিয়ে চীনা মুদ্রা ইউয়ানকে বিকল্প হিসেবে সামনে আনতে চাইছে ইরান ও চীন।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান কার্যত একটি ‘টোল বুথ’ ব্যবস্থা চালু করেছে, যেখানে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে ইউয়ানে ট্রানজিট ফি পরিশোধ করতে হচ্ছে। লয়েডস লিস্টের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত দুটি জাহাজ ২৫ মার্চ পর্যন্ত ইউয়ানে এই ফি পরিশোধ করেছে, যদিও মোট কতগুলো জাহাজ এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে তা স্পষ্ট নয়।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই তথ্যের ইঙ্গিতপূর্ণ স্বীকৃতি দিয়েছে। একইসঙ্গে ইরানের জিম্বাবুয়ের দূতাবাস থেকে জানানো হয়েছে, বৈশ্বিক তেল বাজারে ‘পেট্রোইউয়ান’ ব্যবহারের সময় এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। তবে চীন বা ইরান এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ও সাবেক আইএমএফ প্রধান অর্থনীতিবিদ কেনেথ রোগফের মতে, ইউয়ান ব্যবহারের এই উদ্যোগ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা এড়ানো এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার কৌশলও।
বহুমেরুকেন্দ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার লক্ষ্য
ইরান ও চীন মনে করে, ইউয়ান ব্যবহারের মাধ্যমে তারা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নির্ভর আর্থিক ব্যবস্থাকে পাশ কাটাতে পারবে এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ব্যয়ও কমবে। ২০২১ সালে স্বাক্ষরিত ২৫ বছরের কৌশলগত চুক্তির পর থেকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের লক্ষ্য একটি ‘বহুমেরুকেন্দ্রিক’ আর্থিক বিশ্ব গড়ে তোলা, যেখানে একক মুদ্রা নয় বরং একাধিক দেশের মুদ্রা প্রভাব বিস্তার করবে। যুক্তরাজ্যের কিল বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ বোলেন্ট গোকেই বলেন, ইউয়ানের ব্যবহার ইরানের কৌশলের অংশ, যা মার্কিন আর্থিক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চায়।
বর্তমানে ইরানের রপ্তানি হওয়া তেলের ৮০ শতাংশেরও বেশি চীন কিনে নেয়, অনেক সময় ছাড় মূল্যে। বিনিময়ে ইরান চীন থেকে যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস ও শিল্পপণ্য আমদানি করে।
ডলারের শক্ত অবস্থান
বিশ্লেষকদের মতে, ইউয়ানের ব্যবহার বাড়লেও ডলারের বিকল্প হওয়া এখনো অনেক দূরের বিষয়। চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং ২০২৪ সালে ইউয়ানকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ভবিষ্যতের রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে দেখতে চান বলে আশা প্রকাশ করেছিলেন।
তবে চীনের কঠোর পুঁজি নিয়ন্ত্রণের কারণে ইউয়ান এখনো সম্পূর্ণ বিনিময়যোগ্য নয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফ-এর তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক রিজার্ভের ৫৭ শতাংশ ডলারে, ২০ শতাংশ ইউরোতে এবং মাত্র ২ শতাংশ ইউয়ানে রয়েছে।
এছাড়া ২০২৪ সালে আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যের মাত্র ৩.৭ শতাংশ ইউয়ানে নিষ্পত্তি হয়েছে, যা ২০১২ সালের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হলেও এখনো সীমিত।
ন্যাটিক্সিসের এশিয়া-প্যাসিফিক প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যালিসিয়া গার্সিয়া হিরেরো বলেন, ইউয়ানের ব্যবহার বাড়লেও তা ডলারের আধিপত্যকে পুরোপুরি হুমকিতে ফেলছে না।
ধীরগতির পরিবর্তনের ইঙ্গিত
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান-চীন বাণিজ্য ডলারের বিকল্প তৈরি করতে না পারলেও নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। ইউয়ানের ব্যবহার ধীরে ধীরে ডলারের আধিপত্যকে ক্ষয় করতে পারে বলে মত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
অর্থনীতিবিদ কেনেথ রগোফ বলেন, ভবিষ্যতে পরিস্থিতি নির্ভর করবে ভূরাজনৈতিক সংঘাত ও কৌশলগত সাফল্যের ওপর। অনেক দেশ যদি নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে শুরু করে, তাহলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পরিবর্তনের গতি বাড়তে পারে।
সার্বিক বিশ্লেষণ
বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনো দ্রুত পরিবর্তন নয় বরং দীর্ঘমেয়াদে ধীরে ধীরে ডলারের প্রভাব কমার একটি প্রক্রিয়া। চীন ও ইরানের এই আর্থিক সহযোগিতা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ‘সামান্য কিন্তু ধারাবাহিক চাপ’ তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতে বিকল্প মুদ্রা ব্যবস্থার পথ খুলতে পারে।
ডলারের অবস্থান কতটা পরিবর্তিত হবে, তা নির্ভর করছে আগামী দিনের আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অর্থনৈতিক শক্তির ভারসাম্য এবং বৈশ্বিক সম্পর্কের গতিপ্রকৃতির ওপর।
সিএ/এএ


