যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে অবশিষ্ট একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি ‘নিউ স্টার্ট’-এর মেয়াদ বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) শেষ হয়েছে। এর ফলে কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবার বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর দুই পারমাণবিক দেশের অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর আর কোনো আনুষ্ঠানিক সীমা থাকছে না। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে পারমাণবিক প্রতিযোগিতা ও উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে এই দীর্ঘস্থায়ী কাঠামো ভেঙে পড়ায় সুরক্ষা ঝুঁকি বাড়ছে। সাবেক ভারপ্রাপ্ত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক আন্ডারসেক্রেটারি অব স্টেট থমাস কান্ট্রিম্যান সতর্ক করে বলেন, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি হলো—এটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে এবং কোনো অপ্রত্যাশিত কিংবা প্রত্যাশিত ঘটনা এমন এক সংঘাতের সূত্রপাত করতে পারে, যা দ্রুত পারমাণবিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, চীনের দ্রুত সম্প্রসারিত পারমাণবিক শক্তিকে বিবেচনায় না আনা নিউ স্টার্ট চুক্তিটিকে পুরোনো করে তুলেছিল। তাদের মতে, এই সীমাবদ্ধতাগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে আটকে রাখছিল।
২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে কার্যকর হওয়া নিউ স্টার্ট চুক্তির আওতায় উভয় দেশকে সর্বোচ্চ ১,৫৫০টি মোতায়েনকৃত পারমাণবিক ওয়ারহেডে সীমাবদ্ধ রাখা হয়। পাশাপাশি ৭০০টি মোতায়েনকৃত আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, সাবমেরিন-নিক্ষেপযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, পারমাণবিক সক্ষম বোমারু বিমান এবং মোট ৮০০টি মোতায়েনকৃত ও অ-মোতায়েনকৃত লঞ্চারের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এই কাঠামোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে লক্ষ্য করতে সক্ষম রাশিয়ার আন্তঃমহাদেশীয় পারমাণবিক অস্ত্রের ওপরও নিয়ন্ত্রণ ছিল।
চুক্তির সমালোচক সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন যে এতে চীনের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হয়নি। পেন্টাগনের ২০২২ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমান হারে অস্ত্রভাণ্ডার বাড়ালে ২০৩৫ সালের মধ্যে চীনের কাছে প্রায় ১,৫০০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড থাকতে পারে।
নিউ স্টার্ট মূলত ১০ বছরের জন্য কার্যকর ছিল। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া সম্মতিতে এর মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়ানো হয়, যা ২০২৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি কার্যকারিতা শেষ করেছে। যদিও মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ ছিল না, চাইলে দুই দেশ চুক্তির সীমা মেনে চলতে পারত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠায় অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
গত বছরে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে পারমাণবিক পরীক্ষা চালুর অঙ্গীকার করেছিলেন, যদিও এ বিষয়ে কোনো বাস্তব অগ্রগতি হয়নি। অন্যদিকে গত সেপ্টেম্বরে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আরও এক বছরের জন্য সীমাবদ্ধতা বজায় রাখার প্রস্তাব দেন। সে বিষয়ে ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন—“প্রস্তাবটি আমার কাছে ভালো ধারণা মনে হয়েছে।” তবে সাম্প্রতিক সময়ে তিনি মেয়াদ শেষ হওয়া নিয়ে খুব বেশি উদ্বেগ জানাননি। নিউইয়র্ক টাইমসকে ট্রাম্প বলেন, “মেয়াদ শেষ হলে শেষ হবে। আমরা আরও ভালো একটি চুক্তি করব।”
এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির সীমাবদ্ধতা আর বজায় রাখতে আগ্রহী নয়। তার ভাষায়, “একবিংশ শতাব্দীতে প্রকৃত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় যদি তাতে চীনকে অন্তর্ভুক্ত করা না হয়, কারণ তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার দ্রুত ও ব্যাপকভাবে বাড়ছে।” তবে বেইজিং প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য উভয়ভাবেই ত্রিপক্ষীয় আলোচনার আহ্বান বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে।
চুক্তির অবসান আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে জটিলতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এখন বিশ্বের নজর যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং চীনের সম্ভাব্য নতুন সমীকরণের দিকে, যেখানে ভুল পদক্ষেপ বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষকরা।
সিএ/এসএ


