পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে বিদ্যমান পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে তুরস্ক। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যসহ পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে বলে জানিয়েছে ব্লুমবার্গ।
শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) প্রকাশিত ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে বলা হয়, ত্রিপক্ষীয় এই প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা অনেকটাই অগ্রসর হয়েছে এবং চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত বছরের সেপ্টেম্বরে রিয়াদে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান একটি কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেন। ওই চুক্তি অনুযায়ী, কোনো এক দেশের ওপর হামলা হলে তা উভয় দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন হিসেবে বিবেচিত হবে।
ব্লুমবার্গ জানায়, দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের কৌশলগত স্বার্থ ক্রমশ একে অপরের সঙ্গে মিলছে। এই বাস্তবতায় জোট সম্প্রসারণকে সময়োপযোগী ও যুক্তিসংগত বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নিরাপত্তা নির্ভরতা এবং ন্যাটোতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অঙ্গীকার নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে তুরস্ক এই চুক্তিকে নিজেদের প্রতিরক্ষা কাঠামো জোরদারের একটি সুযোগ হিসেবে দেখছে।
আঙ্কারাভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক টেপাভের কৌশলবিদ নিহাত আলি ওজচান বলেন, সৌদি আরবের রয়েছে শক্তিশালী অর্থনীতি, পাকিস্তানের রয়েছে পারমাণবিক সক্ষমতা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও বিশাল জনবল, আর তুরস্ক দিতে পারে বাস্তব যুদ্ধঅভিজ্ঞতা ও উন্নত প্রতিরক্ষা শিল্প। এই তিন দেশের সমন্বয় একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা জোট গড়ে তুলতে পারে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যখন নিজের ও ইসরাইলের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, তখন আঞ্চলিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে দেশগুলো নতুন করে বন্ধু ও কৌশলগত অংশীদার নির্ধারণে উদ্যোগী হচ্ছে।
এ বিষয়ে তুরস্কের তথ্য মন্ত্রণালয় ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। সৌদি কর্তৃপক্ষও ব্লুমবার্গের মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিক সাড়া দেয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তুরস্কের এই আগ্রহ সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অতীতের টানাপোড়েন পেছনে ফেলে দুই দেশ বর্তমানে অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করছে। চলতি সপ্তাহে আঙ্কারায় দুই দেশের প্রথম যৌথ নৌ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রিয়াদ ও আঙ্কারা উভয়ই ইরানকে ঘিরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসলেও সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্ক ব্যবস্থাপনার পক্ষপাতী।
পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও প্রতিবেদনে গুরুত্ব পেয়েছে। তুরস্ক ইতোমধ্যে পাকিস্তান নৌবাহিনীর জন্য কর্ভেট যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ করছে এবং পাকিস্তান বিমান বাহিনীর এফ-১৬ যুদ্ধবিমান আধুনিকায়নের কাজেও যুক্ত রয়েছে।
এ ছাড়া তুরস্ক উভয় দেশের সঙ্গে ড্রোন প্রযুক্তি ভাগাভাগি করছে এবং তাদের নিজস্ব পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ‘কান’ প্রকল্পে পাকিস্তান ও সৌদি আরবকে যুক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
এই ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা আলোচনা আসে মে মাসে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে চার দিনের সামরিক সংঘর্ষের পর যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে। প্রতিবেদনে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত উত্তেজনা এবং তুরস্ক ও কাতারের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যা এখনো ফলপ্রসূ হয়নি।
দীর্ঘদিন ধরেই পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে কৌশলগত সামরিক সহযোগিতা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের ভিত্তিতে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান। সৌদি আরব পাকিস্তানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সহায়তাদাতা ও জ্বালানি সরবরাহকারী দেশ।
অন্যদিকে, তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সম্পর্কও দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি)-এর ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তুরস্ক পাকিস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ, যা দেশটির মোট অস্ত্র আমদানির প্রায় ১১ শতাংশ।


