ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন–পীড়ন চালায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ‘লকড অ্যান্ড লোডেড’ অবস্থায় হামলা চালাতে প্রস্তুত থাকবে—এমন হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই বক্তব্যের ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তাঁর বাসভবন থেকে অপহরণ করে নিয়ে যায় মার্কিন বিশেষ বাহিনী। মাদক–সন্ত্রাস বা ‘নার্কোটেররিজম’-এর অভিযোগে তাঁকে নিউইয়র্কে বিচারের মুখোমুখি করা হয়।
কারাকাসে এই অভিযানের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন কেবল ভেনেজুয়েলাকে নয়, একই সঙ্গে ইরানকেও একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, ইরান ভেনেজুয়েলা নয়। কারাকাসে যা সম্ভব হয়েছে, তেহরানে তা ঘটানো যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কার্যত অসম্ভব।
ভেনেজুয়েলায় অভিযানের আগে দীর্ঘ ছয় মাস ধরে সিআইএ সক্রিয়ভাবে কাজ করেছিল। মাদুরোর ঘনিষ্ঠ মহলের একজনের মাধ্যমে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। অভিযানের রাতে মার্কিন যুদ্ধবিমান কারাকাস ও আশপাশের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। এরপর বিশেষ বাহিনী দ্রুত অভিযানে গিয়ে প্রেসিডেন্টকে আটক করে নিয়ে আসে। এই অভিযানের সাফল্যের পেছনে বড় কারণ ছিল ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনীর ভেতরের বিশৃঙ্খলা এবং মাদুরোর প্রতি রাশিয়া ও চীনের কার্যত সমর্থন সরে যাওয়া।

ইরানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত বছর জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতে ইরানের কিছু দুর্বলতা প্রকাশ পেলেও একই সঙ্গে স্পষ্ট হয়েছে তাদের টিকে থাকার সক্ষমতা। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দেশটিতে সাম্প্রতিক সময়ে বিক্ষোভ দেখা গেলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যেভাবে এটিকে সুযোগ হিসেবে দেখছে, বাস্তবে বিষয়টি ততটা সরল নয়।
ইসরায়েলের আকস্মিক হামলায় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের কয়েকজন শীর্ষ নেতা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীরা নিহত হন। একই সঙ্গে স্নায়ুযুদ্ধের মাধ্যমে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পদত্যাগ না করলে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। তবু ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কাঠামো একচুলও নড়েনি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের বাংকার–বিধ্বংসী বোমা ব্যবহার করে ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পরও সরকার টালমাটাল হয়নি। বরং জবাবে ইরান শত শত ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে পাল্টা আঘাত হানে, যার কিছু ইসরায়েলের আয়রন ডোম প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে।
এই দৃঢ়তার পেছনে বড় কারণ হলো ইরানের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের হাতে রয়েছে নির্মাণ, টেলিযোগাযোগ ও রপ্তানি খাতে বিস্তৃত ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য, যার মূল্য বহু বিলিয়ন ডলার। এই অর্থনৈতিক স্বার্থ সরাসরি সরকারের টিকে থাকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকায় বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডাররা ব্যবস্থার বাইরে যাওয়ার ঝুঁকি নেন না।
সামরিক শক্তির দিক থেকেও ইরান মধ্যপ্রাচ্যে অন্যতম প্রভাবশালী দেশ। সক্রিয় ও রিজার্ভ মিলিয়ে তাদের সেনাসংখ্যা প্রায় দশ লাখ। শুধু আইআরজিসির অধীনেই রয়েছে অন্তত দেড় লাখ সেনা, যাদের অনেকেই বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় অভ্যস্ত। এর বাইরে বসিজ মিলিশিয়া রয়েছে, যার নিয়মিত ও রিজার্ভ সদস্য মিলিয়ে সংখ্যা কয়েক লাখ।
ভূপ্রকৃতির দিক থেকেও ইরান ভেনেজুয়েলার মতো নয়। দেশটির বড় অংশ পাহাড়বেষ্টিত এবং বিস্তৃত নগরাঞ্চলে ভরা। ফলে সামরিক আগ্রাসন চালানো যেমন কঠিন, তেমনি দীর্ঘমেয়াদি দখল ও নিয়ন্ত্রণ আরও জটিল।
কূটনৈতিক বাস্তবতাও ইরানের পক্ষে। চীন ও রাশিয়ার জন্য ইরান কৌশলগতভাবে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ভেনেজুয়েলার মতো করে তারা ইরানকে ছেড়ে যাবে—এ সম্ভাবনা কম। বরং প্রয়োজন হলে উন্নত গোয়েন্দা সহায়তা, আধুনিক অস্ত্র ও কূটনৈতিক সমর্থন দেওয়ার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
অর্থনৈতিক সংকট ও মূল্যস্ফীতির কারণে ইরানে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ সত্য হলেও তা ২০২২ সালের আন্দোলনের মাত্রার কাছাকাছিও নয়। কয়েক দিনের মধ্যে অন্তত ২০ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন, কিন্তু সরকার কাঠামোর ভেতরে এখনো বড় ধরনের ফাটল দেখা যায়নি। আইআরজিসির ভেতরে কোনো উল্লেখযোগ্য ভাঙন বা পক্ষত্যাগ হয়নি, যা সরকারের পতনের পথ তৈরি করতে পারে।
ইতিহাস বলছে, বাইরের আগ্রাসন ইরানি সমাজকে বিভক্ত করার বদলে বরং একত্রিত করে। গত গ্রীষ্মে ইসরায়েলের উসকানির সময়ও তা স্পষ্ট হয়েছিল। দমন–পীড়নের পাশাপাশি সরকার সমস্যার অস্তিত্ব পুরোপুরি অস্বীকার না করে সমাধানের পথ খোঁজার ইঙ্গিতও দিয়েছে।
নিঃসন্দেহে ইরানের সামনে বাস্তব সংকট রয়েছে—অর্থনৈতিক মন্দা, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক বিরোধ, সর্বোচ্চ নেতার শারীরিক অসুস্থতা এবং উত্তরাধিকার প্রশ্ন ভবিষ্যতে চাপ তৈরি করতে পারে। তবে এসব সংকট ধীরে ধীরে জটিল হয়ে ওঠা বিষয়, হঠাৎ ভেঙে পড়ার মতো দুর্বলতা নয়।
এই প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হস্তক্ষেপ আসলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমাই তুলে ধরে। দুর্বল রাষ্ট্রে হঠাৎ অভিযান চালানো সম্ভব হলেও ইরানের মতো শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও জটিল সমাজকে নিয়ন্ত্রণ বা রূপান্তর করা যুক্তরাষ্ট্র বা ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে বাস্তবসম্মত নয়। এমন কোনো প্রচেষ্টা গোটা অঞ্চলে ইরাকের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী ও ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে।
সিএ/এসএ


