ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ, শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা, মানসিক চাপ এমনকি ডেঙ্গুতে মৃত্যুঝুঁকি—বিভিন্ন গুরুতর স্বাস্থ্যসমস্যার সঙ্গে বায়ুদূষণের সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া যাচ্ছে সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি আর শুধু পরিবেশগত সংকট নয়; বরং গভীর জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে পরিস্থিতি। ঢাকাসহ দেশের কয়েকটি বড় শহর এই ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি রয়েছে শুক্রবার ( ৫ ডিসেম্বর) শনিবার (৬ ডিসেম্বর) রোববার (৭ ডিসেম্বর)।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের বহির্বিভাগে সম্প্রতি রোগীর চাপ বেড়েছে। ৬৫ বছর বয়সী শ্বাসকষ্টের রোগী আবুল কাশেম বলেন, ‘শীতটা আগের চেয়ে কমেছে, কিন্তু কাশি থামে না।’ হাসপাতাল সূত্র জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে এখানে রোগী ছিল ৯ হাজার ৭২ জন, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৮ হাজার ৬১১। চিকিৎসকদের মতে, বক্ষব্যাধি ও শ্বাসতন্ত্রের রোগ বৃদ্ধির পেছনে বায়ুদূষণের বড় ভূমিকা রয়েছে।
ধূলিকণার সঙ্গে বাড়ছে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি
দেশব্যাপী পরিচালিত জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ ২০২২–এর তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, বাতাসে সূক্ষ্ম ধূলিকণা পিএম ২.৫–এর মাত্রা যত বাড়ছে, ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও তত বাড়ছে। প্রতি ঘনমিটারে পিএম ২.৫ মাত্রা ১০ মাইক্রোগ্রাম বাড়লে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি গড়ে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
গবেষণায় ১৫ হাজার ২৪৯ জন প্রাপ্তবয়স্ক অংশ নেন। চূড়ান্ত বিশ্লেষণে রাখা হয় ১৩ হাজার ৯৬৫ জনকে। গবেষণার নেতৃত্ব দেওয়া ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির গবেষক জুয়েল রানা বলেন, দূষিত বায়ু শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি করে এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতা ব্যাহত করে। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মান অর্জন করা গেলে দেশে ডায়াবেটিসের হার ৫ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। নারায়ণগঞ্জের মতো উচ্চ দূষণপ্রবণ জেলায় এ হার ১৬ শতাংশের বেশি কমতে পারে।
অকালমৃত্যু ও অর্থনৈতিক ক্ষতি
সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান পিএম ২.৫ দূষণের কারণে দেশে বছরে প্রায় ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৬ জনের অকালমৃত্যু ঘটছে। হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও ফুসফুস ক্যানসারের সঙ্গে এ মৃত্যুর বড় অংশ যুক্ত।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বছরে প্রায় ২৬ কোটির বেশি কর্মদিবস নষ্ট হচ্ছে দূষণজনিত অসুস্থতায়। হাঁপানিজনিত জরুরি ভর্তি, অপরিণত জন্ম ও কম ওজনের নবজাতকের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে।
মানসিক স্বাস্থ্যেও প্রভাব
ঢাকা ও রাজশাহীর তুলনামূলক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকায় পিএম ২.৫ মাত্রা রাজশাহীর তুলনায় প্রায় ১.৭ গুণ বেশি। ঢাকায় মাঝারি থেকে তীব্র বিষণ্নতার উপসর্গ পাওয়া গেছে প্রায় ৪৬ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষের মধ্যে, যেখানে রাজশাহীতে এ হার ২৮ থেকে ৩২ শতাংশ।
গবেষণায় বলা হয়েছে, পিএম ২.৫ মাত্রা প্রতি ১০ মাইক্রোগ্রাম বৃদ্ধি পেলে উদ্বেগের স্কোর ১ পয়েন্ট পর্যন্ত বাড়তে পারে। উচ্চ দূষণপ্রবণ এলাকায় বসবাসকারীদের মাঝারি–তীব্র বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ১.৬ থেকে ১.৯ গুণ বেশি।
হৃদ্রোগে তাৎক্ষণিক প্রভাব
২০২০ থেকে ২০২৪ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঢাকায় পিএম ২.৫ প্রতি ১০ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার বাড়লে একই মাসে হৃদ্রোগজনিত মৃত্যু গড়ে ৩.১ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। মোট হৃদ্রোগজনিত মৃত্যুর প্রায় ১৬ শতাংশ দূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত। শীতকালে এ ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
ডেঙ্গুতে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায় দূষণ
বৈশ্বিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ দূষণপ্রবণ দেশগুলোয় ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার বেশি। গবেষণার প্রধান লেখক শাকিরুল খান বলেন, ‘এটি প্রথম বৈশ্বিক গবেষণা, যেখানে প্রমাণ করা হয়েছে যে বায়ুদূষণের কারণে ডেঙ্গু যেমন ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি মৃত্যুঝুঁকিও বেড়ে যায়। আমরা দেখেছি, দূষণপ্রবণ দেশগুলোয় ডেঙ্গু তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি প্রাণঘাতী। ডেঙ্গু মোকাবিলায় আমরা এত দিন মূলত মশা নিয়ন্ত্রণের দিকেই গুরুত্ব দিয়েছি। কিন্তু এই গবেষণা দেখাচ্ছে, বায়ুদূষণ কমানোও ডেঙ্গুজনিত মৃত্যু কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হতে পারে।’
শীতকালে বৃষ্টি কমে যাওয়ায় বাতাসে জমে থাকা দূষিত কণিকা ধুয়ে নামার সুযোগ কমছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় শুষ্ক মৌসুমে বৃষ্টিপাত কমেছে, ফলে দূষণ দীর্ঘ সময় স্থায়ী হচ্ছে।
টিবি হাসপাতালের পরিচালক আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, ‘এবার যে রোগী ভর্তি হয়েছে, তা গত পাঁচ বছরে হয়নি। দিন দিন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এখানে আসা রোগীরা কাছাকাছি এলাকার। কিন্তু এ অবস্থা রাজধানীর সর্বত্র। অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, দেশেরও সর্বত্র।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, যানবাহনের ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণ, শিল্পকারখানায় কঠোর মানদণ্ড, ইটভাটা সংস্কার, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহার ও নগর সবুজায়ন ছাড়া পরিস্থিতি বদলানো কঠিন। দূষণ এখন শুধু পরিবেশগত নয়, বহুমাত্রিক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সিএ/এমই


