বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ তিনটি প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ কারণে দেশে মাঝে মধ্যে ভূমিকম্প হওয়া স্বাভাবিক। তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, সম্প্রতি দেশের মধ্যে ভূমিকম্পের উৎপত্তির প্রবণতা বেড়েছে। বিশেষ করে ভূমিকম্পের কম ঝুঁকির অঞ্চল হিসেবে পরিচিত দেশের দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলে এ ধরনের কম্পন বেড়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে থাকা দুই প্লেটের বিপরীতমুখী টানের (টেনশনাল ফোর্স) কারণে দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চল ভূমিকম্পপ্রবণ হয়ে উঠেছে। এছাড়া সেখানে নতুন ফাটল সৃষ্টি বা পুরনো ফাটল পুনরায় সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনাও আছে। তবে এই অঞ্চলের ভূমিকম্পগুলো সাধারণত ভীতিকর নয়।
গতকাল শুক্রবার দুপুরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল কম্পনে কেঁপে ওঠে। উৎপত্তিস্থল ছিল সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৪, যা মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে ধরা হয়। সাতক্ষীরায় কাঁচা ঘরের টালি ঝরঝর করে ভেঙে পড়ে। আতঙ্কে মানুষ ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ছেড়ে রাস্তায় বের হয়। আশাশুনি সদরের আবদুল আলী বলেন, ‘হঠাৎ দোতলা বাড়ি দুলে উঠল। পরিবারের সবাই দ্রুত নিচে নেমে আসে।’
দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের ভূমিকম্প বৃদ্ধি নিয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র জানায়, দেশে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা তিন ভাগে বিভক্ত—অতি ঝুঁকিপূর্ণ, মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ এবং কম ঝুঁকিপূর্ণ। দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চল কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পড়লেও, সাম্প্রতিক সময়ে সাতক্ষীরা ও ঝিনাইদহে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। এছাড়া গত ৩ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরার কলারোয়ায় ৪ দশমিক ১ মাত্রার কম্পন এবং গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর যশোরের মনিরামপুরে ৩ দশমিক ৫ মাত্রার কম্পন নথিভুক্ত হয়েছে।
বাংলাদেশের অবস্থান তিনটি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের মধ্যে—পূর্বাঞ্চলের সাবডাকশন জোন, উত্তরের ডাউকি ফল্ট এবং হিমালয় পাদদেশের হিমালয়ান ফ্রন্টাল থ্রাস্ট। ভূতাত্ত্বিক হুমায়ুন আখতার আশ্বস্ত করেছেন যে, দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলে বড় কোনো সক্রিয় টেকটোনিক প্লেট বাউন্ডারি নেই। তাই মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে, কিন্তু খুব বড় মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা কম।
যুক্তরাষ্ট্রের অবার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আক্তারুল আহসান মনে করছেন, সাতক্ষীরার ভূমিকম্পটি নরসিংদীতে গত বছরের ২১ নভেম্বর ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের আফটার–শক হতে পারে। তিনি জানাচ্ছেন, সাতক্ষীরা ও নরসিংদী এলাকায় উৎপত্তি নতুন আবিষ্কৃত কলকাতা–জামালপুর–ময়মনসিংহ পর্যন্ত ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ফাটলরেখার হিঞ্জ লাইনের মধ্যে পড়ে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র জানায়, ২০২৫ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে এবং সীমান্ত–সংলগ্ন এলাকায় ৩২টি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি—১০টি—বৃহত্তর সিলেট এলাকায়। কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াৎ কবীর বলেন, ‘দেশের অভ্যন্তর এবং সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে ভূমিকম্প বেড়ে যাওয়ার কারণ হলো ভূ–অভ্যন্তরে বিপুল পরিমাণ শক্তি সঞ্চয়, যা একটি বড় আকারের ভূমিকম্পের ইঙ্গিত দেয়।’
অন্যদিকে, অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার বলেন, ‘আগের তুলনায় দেশে এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় ভূমিকম্পের তথ্য সংগ্রহের তৎপরতা বেড়ে গেছে। প্রযুক্তির উন্নয়নের কারণে এখন আমরা বেশি এবং সঠিক মাত্রায় ভূমিকম্প–সংক্রান্ত তথ্য পাচ্ছি।’
সিএ/এমই


