বিশ্বের উপকূলীয় ঝুঁকি নির্ধারণে ব্যবহৃত বহু মানচিত্রে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রকৃত অবস্থার তুলনায় কম দেখানো হয়েছে—এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে নতুন এক গবেষণায়। দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করা হতো, সমুদ্রের উচ্চতা শূন্য থেকে শুরু হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই ভিত্তিগত ধারণাটিই বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ভুল এই হিসাবের কারণে পৃথিবীর অনেক বেশি ভূমি ও বিপুল জনগোষ্ঠী সমুদ্রপৃষ্ঠের খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে, যা আগে অনুমান করা হয়নি। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা ও এলাকার পরিমাণ বাস্তবে আরও বেশি হতে পারে।
ইতালির পাদোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ৩৮৫টি উপকূলীয় ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্থানীয় জলস্তরের পরিবর্তে একটি আনুমানিক বৈশ্বিক মান ব্যবহার করা হয়েছে। বাস্তবে উপকূলীয় জলস্তর ওই মানের তুলনায় অনেক বেশি উচ্চতায় অবস্থান করছে।
এই ত্রুটির কারণে পূর্ববর্তী হিসাবগুলো নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। গবেষণায় উঠে এসেছে, ইউরোপ ও আটলান্টিক অঞ্চলের বাইরে এই ভুলের মাত্রা বেশি। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে উপকূলীয় উচ্চতা পূর্বের হিসাবের তুলনায় তিন ফুটেরও বেশি কম পাওয়া গেছে।
উত্তর আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপে তুলনামূলকভাবে নির্ভুল তথ্য থাকায় সেখানে এই ভুল কম হয়েছে। তবে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার ঘনবসতিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকায় তথ্যের ঘাটতির কারণে ঝুঁকির সঠিক চিত্র এতদিন স্পষ্ট ছিল না।
গবেষকেরা বলছেন, সমস্যার মূল রয়েছে সমুদ্রপৃষ্ঠ নির্ধারণের পদ্ধতিতে। অনেক ক্ষেত্রে জিওআইডি নামের একটি গড় বৈশ্বিক পৃষ্ঠ ব্যবহার করা হয়েছে, যা বাস্তবের পরিবর্তনশীল উপাদান—যেমন বাতাস, জোয়ার-ভাটা, তাপমাত্রা ও লবণাক্ততা—ধরে না। ফলে অধিকাংশ গবেষণায় প্রকৃত উচ্চতা প্রতিফলিত হয়নি।
ভুল সংশোধনের পর দেখা গেছে, সমুদ্রপৃষ্ঠ ৩ দশমিক ৩ ফুট বাড়লে ডুবে যাওয়ার সম্ভাব্য ভূমির পরিমাণ ৩১ থেকে ৩৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা ৭ কোটি ৭০ লাখ থেকে ১৩ কোটি ২০ লাখে পৌঁছাতে পারে, যা আগের হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নতুন তথ্য উপকূলীয় পরিকল্পনা, অবকাঠামো নির্মাণ এবং জলবায়ু অভিযোজন নীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কারণ ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি পরিকল্পনা বাস্তব ঝুঁকি মোকাবিলায় যথেষ্ট কার্যকর নাও হতে পারে।
সিএ/এমআর


