ডিজিটাল যুগ আমাদের হাতে অসীম সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিলেও এর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর অন্ধকার জগৎ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; বরং এক শ্রেণির অপরাধী চক্রের জন্য এটি হয়ে উঠেছে ‘ডিজিটাল টর্চার সেল’। বিশেষ করে টেলিগ্রামকে ঘিরে ইমেজ-ভিত্তিক যৌন নির্যাতন (আইবিএসএ) ও ব্ল্যাকমেল উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
সাইবার অপরাধের শিকার হওয়ার গল্পগুলো প্রায় একই রকম। ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও আদান-প্রদান, যা বিশ্বাসের জায়গা থেকে করা হয়, সেটিই পরিণত হচ্ছে ব্ল্যাকমেলের অস্ত্রে। অনেকেই মনে করেন ‘এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন’ তাদের নিরাপদ রাখবে, কিন্তু বাস্তবে অপরাধীরা ব্যবহারকারীর ডিভাইস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।
রিমোট অ্যাকসেস ট্রোজান (র্যাট) নামের ম্যালওয়্যারের মাধ্যমে ফোনের ক্যামেরা, স্ক্রিন এমনকি ব্যক্তিগত তথ্যও দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। একটি সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক করা বা অজানা অ্যাপ ইনস্টল করাই হতে পারে বড় বিপদের শুরু।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অপরাধগুলো একটি পরিকল্পিত ‘ডিজিটাল ফানেল’-এর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। প্রথমে টোপ হিসেবে বিকৃত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে আগ্রহ তৈরি করা হয়। এরপর গ্রুপে যুক্ত হওয়ার শর্ত দিয়ে ব্যবহারকারীদের মাধ্যমে আরও মানুষকে যুক্ত করা হয়।
পরবর্তী ধাপে অর্থের বিনিময়ে ‘প্রিমিয়াম’ বা ‘ভিআইপি’ সেবার প্রলোভন দেখানো হয়। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে এই লেনদেন চলে। একবার কেউ এই ফাঁদে পড়লে শুরু হয় আসল বিপদ—ব্যক্তিগত তথ্য বা ছবি প্রকাশের হুমকি দিয়ে বড় অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়।
অপরাধী চক্রগুলো এখন করপোরেট ধাঁচে বিভিন্ন প্যাকেজও চালু করেছে—বেসিক থেকে লাইফটাইম সদস্যপদ পর্যন্ত। কিন্তু এসব আসলে একটি সুপরিকল্পিত প্রতারণার অংশ।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতার বিকল্প নেই। ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও শেয়ার করার আগে ভাবা, দুই স্তরের নিরাপত্তা (টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন) চালু রাখা এবং সন্দেহজনক লিংক এড়িয়ে চলা অত্যন্ত জরুরি।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কারও সম্মতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেল করা গুরুতর অপরাধ। এ ধরনের ঘটনায় ভুক্তভোগীদের উচিত ভয় না পেয়ে প্রমাণ সংগ্রহ করে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেওয়া।
ডিজিটাল দুনিয়ায় সামান্য অসতর্কতাও বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। মনে রাখতে হবে, ভুক্তভোগী কখনো অপরাধী নয়—অপরাধীদের আইনের আওতায় আনাই একমাত্র সমাধান।
সিএ/এমআর


