প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়ছে ইলেকট্রনিক বর্জ্য বা ই-বর্জ্যের পরিমাণ। ব্যবহৃত বা দীর্ঘদিন অব্যবহৃত বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম থেকে তৈরি এসব বর্জ্যে একদিকে যেমন সিসা ও পারদের মতো ক্ষতিকর পদার্থ থাকে, অন্যদিকে তাতে সোনা সহ বিভিন্ন মূল্যবান ধাতুও পাওয়া যায়। এই ই-বর্জ্য থেকেই পরিবেশবান্ধব উপায়ে সোনা উদ্ধারের নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন সুইজারল্যান্ডের ইটিএইচ জুরিখের একদল বিজ্ঞানী।
গবেষকদের উদ্ভাবিত পদ্ধতিটির বিশেষত্ব হলো এতে ব্যবহার করা হয়েছে দুগ্ধশিল্পের উপজাত হুই বা ছানার পানি থেকে পাওয়া প্রোটিন। সাধারণত পনির তৈরির সময় উৎপন্ন এই তরল উপজাত ফেলে দেওয়া হয়। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এটিকেই কাজে লাগিয়ে ই-বর্জ্য থেকে সোনা সংগ্রহের একটি নতুন কৌশল তৈরি করেছেন।
ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাদারবোর্ড, কানেক্টর এবং সার্কিটের বিভিন্ন অংশে সোনা ব্যবহার করা হয়, কারণ এটি অত্যন্ত সুপরিবাহী এবং সহজে মরিচা ধরে না। গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ২০টি পরিত্যক্ত কম্পিউটারের মাদারবোর্ড থেকে বিজ্ঞানীরা প্রায় ৪৫০ মিলিগ্রাম উচ্চমানের ২২ ক্যারেট সোনা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন। গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী অ্যাডভান্সড ম্যাটেরিয়ালসে প্রকাশিত হয়েছে।
জাতিসংঘের প্রশিক্ষণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে বিশ্বে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ টন ই-বর্জ্য তৈরি হয়েছে, যা এ খাতের জন্য একটি রেকর্ড। বিশেষজ্ঞদের মতে, ই-বর্জ্যের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর মধ্যে থাকা মূল্যবান ধাতু পুনরুদ্ধারের সুযোগও বাড়ছে।
গবেষণার অংশ হিসেবে বিজ্ঞানীরা হুই প্রোটিনকে উচ্চ তাপমাত্রা ও অ্যাসিডের মাধ্যমে ডিনেচারড করে ছোট ছোট তন্তু তৈরি করেন, যাকে অ্যামাইলয়েড ফাইব্রিল বলা হয়। এই ন্যানোমিটার আকারের তন্তুগুলো পরে স্পঞ্জের মতো কাঠামোয় রূপ দেওয়া হয়। এরপর যখন এই প্রোটিন স্পঞ্জকে মাদারবোর্ড থেকে তৈরি দ্রবীভূত দ্রবণে রাখা হয়, তখন এটি অনেকটা আণবিক চুম্বকের মতো কাজ করে এবং সোনার কণাগুলোকে নিজের দিকে টেনে নেয়।
বিজ্ঞানীদের মতে, বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার না করে জৈব উপাদান দিয়ে সোনা উদ্ধারের এই পদ্ধতি পরিবেশবান্ধব এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক। ইটিএইচ জুরিখের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৪৫০ মিলিগ্রাম ২২ ক্যারেট সোনার বাজারমূল্য এ পদ্ধতিতে আহরণের ব্যয়ের তুলনায় অনেক বেশি। প্রকৃতপক্ষে এতে জ্বালানি ও কাঁচামালের খরচ বাজারমূল্যের প্রায় ৫০ গুণ কম।
গবেষকদের ধারণা, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হলে খনি থেকে সোনা উত্তোলনের তুলনায় এটি দ্রুত, সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সিএ/এমআর


