আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আর কল্পনার বিষয় নয়, বরং বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠেছে। বিশ্বের প্রভাবশালী সামরিক শক্তিগুলো তাদের অপারেশনাল সক্ষমতা বাড়াতে ক্রমবর্ধমান হারে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। রসদ সরবরাহ ব্যবস্থাপনা সহজ করা থেকে শুরু করে বিপুল পরিমাণ গোয়েন্দা তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই সামরিক বাহিনীর কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে এআই।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামরিক কার্যক্রমে এআই ব্যবহারের পরিধি দ্রুত বাড়ছে। নেটো জোট থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন পর্যন্ত নানা সামরিক প্রতিষ্ঠানে এ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। তবে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণঘাতী সিদ্ধান্ত গ্রহণে এআইয়ের ভূমিকা নিয়ে নীতিগত বিতর্কও তৈরি হয়েছে।
সামরিক খাতে এআই ব্যবহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি, সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ এবং বিভিন্ন সামরিক কার্যক্রমে ডেটা বিশ্লেষণের জন্য প্রযুক্তি কোম্পানি প্যালান্টিরের এআই টুল ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেন ও নেটো। সরকারি সংস্থাগুলোর জন্য এই কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে তথ্য বিশ্লেষণ ও নজরদারি প্রযুক্তি সরবরাহ করে আসছে।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্যালান্টিরের সঙ্গে প্রায় ২৪ কোটি পাউন্ড মূল্যের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এ চুক্তির মাধ্যমে সামরিক তথ্য বিশ্লেষণ ও ব্যবস্থাপনায় উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।
গত বছরের শেষ দিকে প্যালান্টিরের এআইচালিত প্রতিরক্ষা প্ল্যাটফর্ম মাভেনকে নেটোর বিভিন্ন ব্যবস্থার সঙ্গে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া তথ্য, গোয়েন্দা রিপোর্টসহ বিপুল পরিমাণ সামরিক তথ্য একত্র করা সম্ভব হয়।
প্যালান্টিরের যুক্তরাজ্য শাখার প্রধান লুইস মোসলে বলেছেন, “এসব তথ্য পরবর্তীতে ক্লড-এর মতো বাণিজ্যিক এআই সিস্টেমের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা যায়, যা উপযোগী ক্ষেত্রে আরও দ্রুত, দক্ষ ও শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।”
তবে এআই প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল বা এলএলএম মাঝেমধ্যে ভুল তথ্য তৈরি করতে পারে, যাকে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা ‘হ্যালুসিনেশন’ বলে উল্লেখ করেন।
নেটোর টাস্ক ফোর্স মাভেনের চিফ ডেটা অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল অ্যামান্ডা গুস্তাভ বলেছেন, এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানুষের তদারকি সবসময় বজায় রাখা হয়। তাঁর ভাষায়, এআই কখনোই মানুষের পরিবর্তে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে না এবং পুরো প্রক্রিয়ায় মানব নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা হয়।
অন্যদিকে কিছু প্রযুক্তি কোম্পানি অটোনমাস মারণাস্ত্রের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার পক্ষে না হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মানুষের উপস্থিতি জরুরি বলে মনে করে।
ইউনিভার্সিটি অফ অক্সফোর্ডের অধ্যাপক মারিয়ারোসারিয়া তাদেও মনে করেন, পেন্টাগনের সঙ্গে কিছু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কের পরিবর্তনের কারণে এ আলোচনায় নিরাপত্তা সচেতন কিছু পক্ষ বাদ পড়ে গেছে, যা ভবিষ্যতে একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
জার্মানির পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফ্রাঙ্কফুর্টের এআই ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ টমাস রেইনহোল্ড বলেন, বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনী এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এক ধরনের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এ ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের কারণে যুক্তরাষ্ট্র অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, “এআই এরইমধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ, নজরদারি ব্যবস্থা, স্বচালিত প্ল্যাটফর্ম, লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনা, সাইবার প্রতিরক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণের পূর্বাভাস দেওয়ার কাজে জড়িয়ে। যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত এক্ষেত্রে সবার আগে এ প্রযুক্তি গ্রহণ করেছে। তবে এ প্রবণতা এখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।”
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জানুয়ারির শুরুতে কারাকাস থেকে তৎকালীন ভেনিজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার একটি অভিযানে ক্লড নামের এআই ব্যবহারের কথাও উঠে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযানে এআই ব্যবহার শুরু করলেও এখনও এটি সব সামরিক পরিকল্পনা ও সিস্টেমে পুরোপুরি একীভূত হয়নি। তবে পূর্ব ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে ইতোমধ্যে এ প্রযুক্তির সক্রিয় ব্যবহার দেখা যাচ্ছে।
রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ, ড্রোন পরিচালনা এবং ইলেকট্রনিক জ্যামিং প্রতিরোধে এআই ব্যবহার করছে। পাশাপাশি মানুষের তুলনায় দ্রুত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণেও এ প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আরও জানা গেছে, বিভিন্ন এআই ল্যাব পেন্টাগনের সঙ্গে আলোচনায় রয়েছে, যাতে সামরিক ব্যবস্থায় তাদের প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কতটুকু নিয়ন্ত্রণ থাকবে তা নির্ধারণ করা যায়। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের সঙ্গে ওপেনএআই, গুগল ও এক্সএআইসহ বেশ কয়েকটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানেরও চুক্তি রয়েছে।
সিএ/এমআর


