মহাবিশ্বের বিশাল আকারের কিছু তারা অস্বাভাবিক শক্তি ও তেজ নিয়ে জন্ম নেয়। এসব তারার উজ্জ্বলতা ও আকার সাধারণ তারার তুলনায় অনেক বেশি এবং এরা তুলনামূলক স্বল্প সময়েই তাদের জীবনচক্র শেষ করে। সম্প্রতি জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এমনই এক অতিকায় তারার আচরণে নাটকীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন, যা তাদের গবেষণায় নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
গবেষকদের মতে, ‘ডব্লিউওএইচ জি৬৪’ নামের এই বিশালাকার তারাটি ভরের দিক থেকে সূর্যের প্রায় ২৮ গুণ বড়। এটি আমাদের ছায়াপথ মিল্কি ওয়ের পাশের উপগ্রহ গ্যালাক্সি ‘লার্জ ম্যাজেলানিক ক্লাউড’-এ অবস্থিত। বিশাল আকার, উজ্জ্বলতা এবং অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এই তারাকে অনেক সময় তারাজগতের ব্যতিক্রমী উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়।
গত তিন দশকের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, তারাটির আচরণ সাধারণ নক্ষত্রের মতো নয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এত দ্রুত রূপান্তর অন্য কোনো তারার ক্ষেত্রে আগে দেখা যায়নি। এ কারণে তারাটির বিবর্তন নিয়ে নতুন করে গবেষণা শুরু হয়েছে।
২০১৪ সালে বিজ্ঞানীরা প্রথম লক্ষ্য করেন যে তারাটির রঙে পরিবর্তন ঘটছে। আগে এটি ‘এক্সট্রিম রেড সুপারজায়ান্ট’ বা অতিকায় লাল তারা হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে এটি লাল রঙ থেকে হলুদ রঙে রূপান্তরিত হতে শুরু করে এবং দ্রুতই ‘ইয়েলো হাইপারজায়ান্ট’ শ্রেণির তারায় পরিণত হয়। মহাজাগতিক সময়ের হিসেবে এই পরিবর্তন অত্যন্ত দ্রুত ঘটেছে এবং এতে কোনো বিস্ফোরণ বা অগ্ন্যুৎপাতের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
গবেষণাটির নেতৃত্ব দেন এথেন্সের ন্যাশনাল অবজারভেটরির জ্যোতির্বিজ্ঞানী গঞ্জালো মুনিওজ সানচেজ। তিনি বলেছেন, “সাধারণত কোনো তারার বিবর্তন ঘটতে শত কোটি বছর সময় লাগে। মানুষের আয়ুষ্কালের মধ্যে আমরা কেবল আকস্মিক ও প্রচণ্ড ঘটনাগুলোই দেখতে পাই, যেমন অগ্ন্যুৎপাত, দুটি তারার মিলে যাওয়া বা এদের বিস্ফোরক মৃত্যু বা সুপারনোভা।”
গবেষণাটি বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল নেচার অ্যাস্ট্রোনমিতে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণার প্রধান লেখক সানচেজ বলেন, “বর্তমানে প্রচলিত কোনো তারা মডেলই ডব্লিউওএইচ জি৬৪-এর এ নাটকীয় রূপান্তরকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারছে না।”
সূর্যের তুলনায় এই তারাটির উজ্জ্বলতা প্রায় তিন লাখ গুণ বেশি এবং এর ব্যাস প্রায় দেড়শ গুণ বড়। যদি এটি আমাদের সৌরজগতের কেন্দ্রে সূর্যের স্থানে থাকত, তাহলে এর পৃষ্ঠ বৃহস্পতি ও শনির কক্ষপথের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিস্তৃত হতো। এমনকি আলোর গতিতে ভ্রমণ করলেও এই তারাটির উপরিভাগ একবার ঘুরে আসতে প্রায় ছয় ঘণ্টা সময় লাগবে।
প্রায় এক কোটি বছর বয়সী এই তারাটি বর্তমানে তার জীবনের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তুলনামূলকভাবে সূর্যের বয়স প্রায় সাড়ে চারশ কোটি বছর এবং এর সামনে আরও প্রায় পাঁচশ কোটি বছরের আয়ু রয়েছে। পৃথিবী থেকে প্রায় এক লাখ ষাট হাজার আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এই তারাটি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে বিশেষ আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, সূর্যের ভরের আট থেকে তেইশ গুণ বড় তারাগুলো সাধারণত লাল অতিদানব তারায় পরিণত হয়ে শেষ পর্যন্ত সুপারনোভা বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়। কিন্তু যেসব তারার ভর সূর্যের ২৩ থেকে ৩০ গুণ, তাদের শেষ পরিণতি নিয়ে এখনও নিশ্চিত ধারণা পাওয়া যায়নি।
আরও একটি বিষয় গবেষকদের কৌতূহল বাড়িয়েছে। ডব্লিউওএইচ জি৬৪ একটি বাইনারি সিস্টেমের অংশ, অর্থাৎ এটি অন্য একটি তারার সঙ্গে মহাকর্ষীয় টানে আবদ্ধ। সেই সঙ্গী তারার আকার বা বৈশিষ্ট্য এখনও নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। গবেষকদের ধারণা, কোনো এক সময় এই দুটি তারা একে অপরের সঙ্গে মিশে যেতে পারে।
সানচেজ বলেন, “ডব্লিউওএইচ জি৬৪ বিশালাকার এক তারা এবং সূর্যের তুলনায় এর আচরণ সম্পূর্ণ আলাদা।” তিনি আরও বলেন, “জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এ অসাধারণ তারা ব্যবস্থাটির ওপর নজর রাখা অব্যাহত রেখেছেন। মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় তারারা কীভাবে বেঁচে থাকে ও বিলীন হয় আমাদের সেই ধারণা বদলে দেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে ডব্লিউওএইচ জি৬৪।”
সিএ/এমআর


