সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি বা সামরিক মহড়ার সিমুলেশনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেলগুলো মানুষের তুলনায় দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের মতো চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঝুঁকছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, এআই মডেলগুলোকে যখন পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্রের দায়িত্বে রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করা হয়, তখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা পারমাণবিক হামলার পথ বেছে নেয়।
কিংস কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক কেনেথ পেইনের নেতৃত্বে পরিচালিত এ গবেষণায় গুগল, ওপেনএআই এবং অ্যানথ্রপিকের তৈরি বিভিন্ন এআই মডেলকে যুদ্ধের কৌশলগত পরিস্থিতিতে পরীক্ষা করা হয়। সেখানে দেখা যায়, এসব মডেল ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে পারমাণবিক যুদ্ধের দিকে অগ্রসর হওয়ার সুপারিশ করেছে।
এসব তথ্য এমন সময়ে সামনে এসেছে যখন সামরিক ক্ষেত্রে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে অ্যানথ্রপিক ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে মতবিরোধ চলছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই অভিযোগ করেছেন যে পেন্টাগন তাদের এআই মডেলের ওপর থাকা কিছু নিরাপত্তা ব্যবস্থা শিথিল করার অনুরোধ জানিয়েছিল, যা কোম্পানিটি প্রত্যাখ্যান করেছে।
এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প অ্যানথ্রপিককে ‘বামপন্থী পাগলে’ ভরা প্রতিষ্ঠান বলে মন্তব্য করেন এবং বলেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। একই সঙ্গে মার্কিন যুদ্ধ সচিব পিট হেগসেথ প্রতিষ্ঠানটিকে ‘সাপ্লাই চেইন ঝুঁকি’ হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানান।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, মানুষের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে ধরনের ভয়, দ্বিধা বা নৈতিক সংকোচ থাকে, এআই মডেলগুলোর মধ্যে তেমন প্রবণতা নেই। বরং যুদ্ধের পরিস্থিতিতে তারা পারমাণবিক হামলাকে একটি কৌশলগত বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করে।
অধ্যাপক কেনেথ পেইন বলেন, এআই পারমাণবিক অস্ত্রকে কোনো নৈতিক বাধা হিসেবে না দেখে বৈধ এক কৌশলগত বিকল্প হিসেবে দেখে। এরা সাধারণত পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে কেবল লাভ-ক্ষতির হিসেব বা যান্ত্রিক উপায়ে আলোচনা করে।
গবেষণার সিমুলেশনভিত্তিক যুদ্ধে দেখা গেছে, অ্যানথ্রপিকের ক্লড মডেলটি সবচেয়ে বেশি পারমাণবিক হামলার পরামর্শ দিয়েছে। প্রায় ৬৪ শতাংশ ক্ষেত্রে মডেলটি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সুপারিশ করেছে।
অন্যদিকে ওপেনএআইয়ের মডেলগুলো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা ডেডলাইনের মুখে পড়লে বারবার পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের দিকে ঝুঁকেছে। সম্প্রতি অ্যানথ্রপিক ও পেন্টাগনের বিরোধের পর ওপেনএআই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চুক্তি করেছে।
গুগলের জেমিনাই মডেল আরও আগ্রাসী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। মাত্র চারটি নির্দেশ পাওয়ার পরই এটি সাধারণ নাগরিকদের ওপর পূর্ণমাত্রার পারমাণবিক হামলার হুমকি দেয়। এক মহড়ায় জেমিনাই লিখেছে, “তারা যদি এখনই সব কার্যক্রম বন্ধ না করে… তবে আমরা তাদের জনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে কৌশলগত পারমাণবিক হামলা চালাব। আমরা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ার ভবিষ্যৎ মেনে নেব না। হয় আমরা একসঙ্গে জিতব, নয়ত একসঙ্গে ধ্বংস হব।”
তবে গবেষণায় বলা হয়েছে, এ ধরনের হুমকি সরাসরি পূর্ণমাত্রার পারমাণবিক যুদ্ধের দিকে না গিয়ে বরং প্রতিপক্ষের মধ্যে পাল্টা উত্তেজনা তৈরির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। উল্লেখ্য, গবেষণাটি এখনো বিশেষজ্ঞদের আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যায়নি এবং এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে অ্যানথ্রপিক, গুগল ও ওপেনএআই কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি।
সিএ/এমআর


