ব্ল্যাকহোল মানেই প্রবল মহাকর্ষ বল। এমন এক মহাজাগতিক বস্তু, যার টান থেকে আলোও বের হতে পারে না। সাধারণ ধারণায় ব্ল্যাকহোল যেন মহাবিশ্বের এক ভয়ংকর দানব, যা আশপাশের সবকিছু গ্রাস করে নেয়। কিন্তু যদি অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি ব্ল্যাকহোল হঠাৎ করে কোনো মানুষের শরীর ভেদ করে চলে যায়, তাহলে কী ঘটবে? মানুষ কি সঙ্গে সঙ্গে অদৃশ্য হয়ে যাবে, নাকি ঘটবে ভিন্ন কিছু?
এই প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটির পদার্থবিদ রবার্ট শেরার। তিনি গাণিতিক হিসাব কষে দেখার চেষ্টা করেছেন, একটি ক্ষুদ্র ব্ল্যাকহোল মানবদেহের ভেতর দিয়ে গেলে প্রকৃতপক্ষে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
রবার্ট শেরারের আগ্রহের সূত্রপাত ১৯৭০–এর দশকে পড়া একটি বিজ্ঞান কল্পকাহিনি থেকে। সেখানে বর্ণনা ছিল, একটি ছোট ব্ল্যাকহোল একজন মানুষের শরীরের ভেতর দিয়ে গিয়ে তার মৃত্যু ঘটায়। সেই কল্পকাহিনির বাস্তবতা যাচাই করতেই তিনি বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে নামেন।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, মহাবিস্ফোরণের পরপরই মহাবিশ্বের কিছু অঞ্চলে অস্বাভাবিক ঘনত্বের কারণে সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে প্রাইমোরডিয়াল ব্ল্যাকহোল বা আদিম কৃষ্ণগহ্বর। কেউ কেউ মনে করেন, রহস্যময় ডার্ক ম্যাটারের উৎস হিসেবেও এদের ভূমিকা থাকতে পারে। যদিও এমন ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব এখনও নিশ্চিত নয় এবং এ ধরনের পরিবেশ মহাবিশ্বে ছিল খুবই বিরল।
শেরারের হিসাব বলছে, প্রায় ১০ হাজার কোটি টন ভরের একটি ব্ল্যাকহোল মানবদেহে যে ক্ষতি করবে, তা ০.২২ ক্যালিবারের একটি বুলেটের ক্ষতির চেয়েও কম হতে পারে। মানবদেহে গুরুতর ক্ষতি ঘটাতে হলে ব্ল্যাকহোলটির ভর অন্তত ১৪০ বিলিয়ন মেট্রিক টন হতে হবে। এত বিশাল ভর হলেও এর ব্যাস হবে মাত্র ০.৪ পিকোমিটার, যা একটি হাইড্রোজেন পরমাণুর ব্যাসের তুলনায় অনেক ছোট।
যদি এই ক্ষুদ্র ব্ল্যাকহোলটি সেকেন্ডে প্রায় ২০০ কিলোমিটার গতিতে শরীর ভেদ করে যায়, তাহলে তা শরীরের কোষ বা টিস্যুর সঙ্গে দীর্ঘ সময় মিথস্ক্রিয়া করবে না। তবে এর অতিরিক্ত গতি সুপারসনিক শক ওয়েভ তৈরি করবে, যা বন্দুকের গুলির মতো আঘাত হানতে পারে। মূল ক্ষতির কারণ হবে এই ধাক্কা, সরাসরি মহাকর্ষীয় টান নয়।
ব্ল্যাকহোলের টাইডাল ফোর্স বা স্প্যাগেটিফিকেশনের ধারণা অনুযায়ী, শক্তিশালী মহাকর্ষ কোনো বস্তুকে লম্বা করে ছিঁড়ে ফেলতে পারে। কিন্তু এত ক্ষুদ্র স্কেলে এই বল তুলনামূলকভাবে দুর্বল। মানবদেহের কোষ ও পরমাণুর অভ্যন্তরীণ বন্ধন এ শক্তির চেয়ে বেশি শক্তিশালী। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে দেহ ছিঁড়ে যাওয়ার আশঙ্কা কম।
মানবদেহের সবচেয়ে সংবেদনশীল অঙ্গ মস্তিষ্ক। সেটিকে মহাকর্ষীয়ভাবে ছিন্ন করতে ব্ল্যাকহোলটির ভর হতে হবে অন্তত ৭ লাখ কোটি মেট্রিক টন। তবে এমন পরিস্থিতিতেও সুপারসনিক শক ওয়েভের প্রভাবই আগে প্রাণঘাতী হয়ে উঠবে।
সবচেয়ে আশ্বস্ত করার বিষয় হলো, এমন ঘটনার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। শেরারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একজন মানুষের জীবদ্দশায় তো দূরের কথা, প্রতি এক কুইন্টিলিয়ন বছরে হয়তো একবার এমন ঘটনা ঘটতে পারে। অথচ মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১ হাজার ৩৮০ কোটি বছর।
শেরার বলেন, ‘তাত্ত্বিকভাবে আদিম ব্ল্যাকহোল থাকা সম্ভব, কিন্তু বাস্তবে হয়তো এদের কোনো অস্তিত্বই নেই। কোনো গ্রহাণুর সমান ভারী ব্ল্যাকহোল যদি আপনার শরীর ভেদ করে যায়, তবে বুলেটের মতো জখম হয়ে আপনি মারা যাবেন। কিন্তু ব্ল্যাকহোলটি যদি খুব ছোট হয়, তবে সেটা কখন শরীর ভেদ করে চলে যাবে, আপনি টেরই পাবেন না!’
সিএ/এমআর


