সময়কে আমরা প্রতিদিন ঘড়ির কাঁটায় মেপে চলি। কিন্তু এই হিসাবের ভেতরে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের ইতিহাস। কেন এক দিনে ২৪ ঘণ্টা, এক ঘণ্টায় ৬০ মিনিট, আর এক মিনিটে ৬০ সেকেন্ড—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় প্রাচীন মিসর ও ব্যাবিলনের সভ্যতায়।
ইতিহাসবিদদের মতে, দিনকে ২৪ ভাগে বিভক্ত করার প্রথা চালু করে প্রাচীন মিসরীয়রা। শুরুতে তারা সূর্যঘড়ির সাহায্যে দিনের আলোকে ১০ ভাগে ভাগ করত। ভোর ও গোধূলির জন্য আরও দুটি অংশ যোগ করলে দিনের মোট ভাগ দাঁড়ায় ১২। পরে রাতের সময় নির্ধারণে তারা আকাশের বিশেষ নক্ষত্রপুঞ্জ, যাদের ডেকান বলা হতো, পর্যবেক্ষণ করে রাতকেও ১২ ভাগে ভাগ করে। এভাবে দিন-রাত মিলিয়ে একটি পূর্ণ চক্র হয় ২৪ ঘণ্টা।

তবে এই পদ্ধতিতে একটি সমস্যা ছিল। ঋতুভেদে দিনের দৈর্ঘ্য বদলালে ঘণ্টার দৈর্ঘ্যও বদলে যেত। বিষুব দিন ছাড়া বছরের অন্য সময় ঘণ্টাগুলো সমান থাকত না। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে গ্রিক জ্যোতির্বিদ হিপার্কাস প্রস্তাব দেন দিনকে ২৪টি সমান ভাগে ভাগ করার। অনেক পরে ইউরোপে যন্ত্রচালিত ঘড়ির প্রচলনের পর এই সমান ঘণ্টার ধারণা প্রতিষ্ঠা পায়।
১২ সংখ্যাটি কেন বেছে নেওয়া হয়েছিল, তার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় হাতের আঙুলের গোনায়। বুড়ো আঙুল দিয়ে অন্য চার আঙুলের তিনটি করে কড় গোনা যায়, ফলে এক হাতে মোট ১২ পর্যন্ত গণনা সম্ভব। এই সহজ পদ্ধতি ১২ সংখ্যাকে জনপ্রিয় করে তোলে।
অন্যদিকে মিনিট ও সেকেন্ডের ক্ষেত্রে প্রভাব এসেছে প্রাচীন সুমেরীয় ও ব্যাবিলনীয়দের ৬০-ভিত্তিক সেক্সাজেসিমাল সংখ্যাপদ্ধতি থেকে। ৬০ একটি বিভাজ্য সংখ্যা; একে ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ১০, ১২, ১৫, ২০ ও ৩০ দিয়ে ভাগ করা যায়। ফলে ভগ্নাংশের জটিলতা কমে। এক ঘণ্টাকে ৬০ মিনিট এবং এক মিনিটকে ৬০ সেকেন্ডে ভাগ করার ধারণা সেখান থেকেই এসেছে।

বৃত্তকে ৩৬০ ডিগ্রিতে ভাগ করার ধারণাও এই ৬০-ভিত্তিক পদ্ধতির ফল। পরে প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সময়ের আরও সূক্ষ্ম একক—মিলিসেকেন্ড, মাইক্রোসেকেন্ড ও ন্যানোসেকেন্ড—চালু হয়েছে, যেখানে দশমিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
ফরাসি বিপ্লবের পর দিনকে ১০ ঘণ্টায় ভাগ করার প্রস্তাব উঠেছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনের অভ্যাস বদলানো সহজ হয়নি। ফলে প্রাচীন পদ্ধতিই টিকে গেছে। আজও ঘড়ির প্রতিটি কাঁটা সেই ইতিহাসের সাক্ষী বহন করে।
সিএ/এমআর


