মরুভূমি মানেই ধু ধু বালির প্রান্তর—এমন ধারণাই আমাদের অনেকের মনে গেঁথে আছে। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য, পৃথিবীর সবচেয়ে শুষ্ক কিছু মরুভূমি সমুদ্রের একেবারে গা ঘেঁষে অবস্থিত। দক্ষিণ আফ্রিকার নামিব মরুভূমি আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে, আর চিলির আতাকামা মরুভূমি প্রশান্ত মহাসাগরের পাশে গড়ে উঠেছে। প্রশ্ন হলো, এত বিশাল জলরাশি পাশে থাকলেও এসব অঞ্চল এত শুষ্ক কেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাগরের পাশে মরুভূমি সৃষ্টির পেছনে মূলত তিনটি কারণ কাজ করে—বাতাসের উল্লম্ব চলাচল, আড়াআড়ি বায়ুপ্রবাহ এবং পাহাড়ি বাধা বা রেইন শ্যাডো প্রভাব।
প্রথমত, বিষুবরেখা অঞ্চলে সূর্যের তাপ সরাসরি পড়ে। এতে বাতাস গরম হয়ে ওপরে উঠে যায় এবং নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়। ওপরে ওঠা বাতাস ঠান্ডা হয়ে বৃষ্টি ঝরায়। এ কারণে বিষুবীয় অঞ্চলে ঘন অরণ্য দেখা যায়। কিন্তু এই গরম বাতাস ওপরে উঠে উত্তর ও দক্ষিণে সরে গিয়ে আবার নিচে নামে। নিচে নামার সময় বাতাস শুষ্ক থাকে এবং মেঘ গঠনে বাধা দেয়। ফলে বৃষ্টি কম হয় এবং মরুভূমি গড়ে ওঠে। সাহারা ও কালাহারির মতো মরুভূমি এভাবেই তৈরি হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, আড়াআড়ি বায়ুপ্রবাহ ও সাগরের শীতল স্রোত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিষুবীয় অঞ্চলে পূর্ব থেকে পশ্চিমমুখী বায়ুপ্রবাহ মহাদেশের পূর্বদিকে বৃষ্টি ঝরালেও পশ্চিমে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তা শুষ্ক হয়ে যায়। আবার উপকূল ঘেঁষে প্রবাহিত শীতল সমুদ্রস্রোতের ওপর দিয়ে বাতাস গেলে সেটিও ঠান্ডা হয়। ঠান্ডা বাতাস সহজে ওপরে উঠতে পারে না, ফলে মেঘ তৈরি হয় না। তবে এই বাতাসে জলীয় বাষ্প থাকায় উপকূলীয় মরুভূমিতে ঘন কুয়াশা দেখা যায়। নামিব মরুভূমিতে এমন কুয়াশা সাধারণ ঘটনা।
তৃতীয় কারণ হলো পাহাড়ি বাধা। জলীয় বাষ্পে ভরা বাতাস যখন উঁচু পর্বতে ধাক্কা খায়, তখন তা ওপরে উঠে ঠান্ডা হয়ে পাহাড়ের এক পাশে বৃষ্টি ঝরায়। কিন্তু অন্য পাশে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বাতাস একেবারে শুষ্ক হয়ে পড়ে। একে রেইন শ্যাডো বলা হয়। আতাকামা মরুভূমির ক্ষেত্রে আমাজন অঞ্চল ও আন্দিজ পর্বতমালার প্রভাব উল্লেখযোগ্য। আন্দিজ পর্বত বৃষ্টির জল আটকে দেয়, ফলে পর্বতের পশ্চিম পাশে বৃষ্টি প্রায় হয় না।
সাগরঘেঁষা মরুভূমির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো তুলনামূলক শীতল আবহাওয়া। ভেতরের মরুভূমির মতো অতিরিক্ত গরম নয়, বরং কুয়াশা ও শীতল স্রোতের কারণে আবহাওয়া অনেক সময় সহনীয় থাকে। এখানকার কিছু প্রাণী কুয়াশা থেকে জল সংগ্রহ করে বেঁচে থাকার কৌশল শিখেছে।
শুধু গরম অঞ্চল নয়, পৃথিবীর মেরু এলাকাও একধরনের মরুভূমি। অ্যান্টার্কটিকা ও আর্কটিক অঞ্চলে তাপমাত্রা অত্যন্ত কম থাকায় বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণও কম। চারপাশে বরফে ঢাকা থাকলেও বৃষ্টিপাত অত্যন্ত সামান্য। তাই এগুলোকে মেরু মরুভূমি বলা হয়।
সব মিলিয়ে দেখা যায়, সমুদ্রের পাশে মরুভূমি গড়ে ওঠা কোনো বিরল ঘটনা নয়। বরং বৈশ্বিক বায়ুপ্রবাহ, সমুদ্রস্রোত ও ভৌগোলিক গঠনের সম্মিলিত প্রভাবেই এমন বৈপরীত্যপূর্ণ প্রাকৃতিক দৃশ্য তৈরি হয়।
সিএ/এমআর


