ছোটবেলায় সুতোয় ঢিল বেঁধে মাথার ওপর ঘোরানোর অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। আবার নাগরদোলা বা রোলার কোস্টারে চড়ার সময় বাইরের দিকে ছিটকে যাওয়ার অনুভূতিও অচেনা নয়। এই পরিচিত অনুভূতির পেছনে কাজ করে পদার্থবিজ্ঞানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা—কেন্দ্রমুখী বল ও কেন্দ্রবিমুখী বল।
কোনো বস্তুকে সোজা পথে চলতে না দিয়ে যখন বৃত্তাকার পথে ঘোরানো হয়, তখন তাকে কেন্দ্রের দিকে টেনে রাখে যে বল, সেটিই কেন্দ্রমুখী বল। বৃত্তাকার পথে চলা বস্তুকে কেন্দ্রের দিকে টেনে রাখা বলই কেন্দ্রমুখী বল। এই বল না থাকলে বস্তুটি তার জড়তার কারণে সোজা পথে ছুটে যেত।
মহাকাশে গ্রহগুলো সূর্যের চারদিকে ঘোরে মূলত সূর্যের মহাকর্ষ বলের কারণে। নিউটনের সূত্র অনুযায়ী, এই মহাকর্ষ বল অদৃশ্য সুতোর মতো গ্রহগুলোকে কেন্দ্রের দিকে টেনে রাখে। যদি হঠাৎ এই বল বিলীন হয়ে যেত, তবে গ্রহগুলো বৃত্তাকার কক্ষপথ ছেড়ে সোজা পথে ছুটে মহাকাশে দূরে সরে যেত।
একই ঘটনা ঘটে সুতোয় বাঁধা ঢিলের ক্ষেত্রে। ঘোরানোর সময় সুতো ছিঁড়ে গেলে ঢিলটি আর বৃত্ত ধরে না ঘুরে, যে মুহূর্তে ছিঁড়েছে সেই বিন্দুর স্পর্শকের দিক বরাবর সোজা পথে ছিটকে যায়। অর্থাৎ এটি কেন্দ্র থেকে বাইরে নয়, বরং সোজা পথে এগিয়ে যায়।
গাণিতিকভাবে কেন্দ্রমুখী বলের মান প্রকাশ করা হয় F = mv2/r সূত্রে। এখানে m হলো বস্তুর ভর, v হলো বেগ এবং r হলো বৃত্তের ব্যাসার্ধ। বেগ যত বেশি বা ব্যাসার্ধ যত কম হবে, প্রয়োজনীয় কেন্দ্রমুখী বল তত বেশি হবে।
অনেকেই কেন্দ্রবিমুখী বলকে বাস্তব বল মনে করেন। রোলার কোস্টারে লুপ পার হওয়ার সময় বা গাড়ির তীক্ষ্ণ মোড়ে শরীরের বাইরের দিকে হেলে পড়ার অনুভূতি আসলে জড়তার ফল। শরীর সোজা পথে চলতে চায়, কিন্তু বাহন বৃত্তাকার পথে ঘুরতে থাকায় আমরা একটি কাল্পনিক বাইরের ধাক্কা অনুভব করি, যাকে কেন্দ্রবিমুখী বল বলা হয়।
নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী, প্রত্যেক ক্রিয়ার সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে। সুতোয় বাঁধা টেনিস বলকে কেন্দ্রের দিকে টানলে বলটিও সমান বলে হাতকে বাইরের দিকে টানে। এই প্রতিক্রিয়াকেও অনেকে কেন্দ্রবিমুখী বল হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
সব মিলিয়ে কেন্দ্রমুখী বল বস্তুকে কক্ষপথে ধরে রাখে, আর কেন্দ্রবিমুখী বল হলো ঘূর্ণনের ভেতরে থাকা পর্যবেক্ষকের অনুভূত একটি প্রতিক্রিয়া। দড়ি ছিঁড়ে গেলে ঢিল বাইরে বৃত্ত বরাবর নয়, বরং সোজা পথে ছুটে যায়—এটাই পদার্থবিজ্ঞানের সরল ব্যাখ্যা।
সিএ/এমআর


