১৯৬৯ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত পরিচালিত অ্যাপোলো কর্মসূচির ছয়টি মিশনে নভোচারীরা চাঁদ থেকে মোট ৩৮২ কেজি পাথর, বালি ও ধুলার নমুনা পৃথিবীতে নিয়ে আসেন। এর মধ্যে শুধু অ্যাপোলো ১৭ মিশনেই আনা হয়েছিল প্রায় ১১০ কেজি নমুনা। এসব সংগ্রহ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার তত্ত্বাবধানে কঠোর নিরাপত্তায় সংরক্ষিত রয়েছে।
ইন্টারনেটে নানা ধরনের পণ্যের মতো মাঝেমধ্যে চাঁদের মাটি বা পাথর বিক্রির বিজ্ঞাপনও দেখা যায়। কেউ কেউ দাবি করেন, এগুলো অ্যাপোলো মিশনে আনা আসল নমুনা। তবে বাস্তবে অ্যাপোলো মিশনের কোনো নমুনা খোলাবাজারে বিক্রির সুযোগ নেই। নাসার আনা চাঁদের পাথর কেনাবেচা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং এটি গুরুতর রাষ্ট্রীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।
২০০২ সালে নাসার জনসন স্পেস সেন্টার থেকে তিন শিক্ষানবিশ থ্যাড রবার্টস, টিফানি ফাউলার এবং শায়ে সাউর প্রায় ৮ কেজি চাঁদের পাথর চুরি করেন। এর আনুমানিক মূল্য ছিল প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ডলার। তারা বিশেষ বডি স্যুট, ভুয়া পরিচয়পত্র ও নিরাপত্তা ক্যামেরায় কারসাজির মাধ্যমে পাথরগুলো সরিয়ে নিতে সক্ষম হন। পরে বেলজিয়ামের এন্টওয়ার্প মিনারেলজি ক্লাবের ওয়েবসাইটে বিক্রির বিজ্ঞাপন দিলে এফবিআই ক্রেতা সেজে ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোর একটি হোটেলে তাদের গ্রেপ্তার করে। মূল অভিযুক্ত রবার্টসের আট বছরের কারাদণ্ড হয় এবং অন্যরা গৃহবন্দী শাস্তি পান।
চাঁদের নমুনাগুলো টেক্সাসের হিউস্টনে অবস্থিত নাসার লুনার স্যাম্পল ল্যাবরেটরি ফ্যাসিলিটিতে সংরক্ষিত। ১৯৭৯ সালে চালু হওয়া এই স্থাপনাটি দূষণমুক্ত ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে নমুনা রক্ষার জন্য বিশেষভাবে তৈরি। প্রতিটি পাথরের বিস্তারিত তালিকা ও ক্যাটালগ সংরক্ষণ করা হয়েছে। স্টেইনলেস স্টিলের বিশেষ কেবিনেটে, বিশুদ্ধ নাইট্রোজেন গ্যাসের পরিবেশে এবং তিন স্তরের গ্লাভস ব্যবহার করে এসব নমুনা স্পর্শ করা হয়, যাতে পৃথিবীর বাতাস বা আর্দ্রতা এগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারে।
আইন অনুযায়ী, নাসার সম্পত্তি চুরি বা আত্মসাৎ করা গুরুতর অপরাধ। চাঁদের পাথর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। ৫ হাজার ডলারের বেশি মূল্যের কোনো চুরি করা সম্পদ এক অঙ্গরাজ্য থেকে অন্য অঙ্গরাজ্যে নেওয়া হলে পাচারের অভিযোগও যুক্ত হয়। ফলে অ্যাপোলো মিশনের আনা কোনো বস্তু কেনাবেচা করলে কারাদণ্ড ও বড় অঙ্কের জরিমানার ঝুঁকি রয়েছে।
তবে প্রাকৃতিকভাবে পৃথিবীতে পতিত চাঁদের উল্কাপিণ্ডের ক্ষেত্রে এ নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য নয়। গবেষণার উদ্দেশ্যে নাসা বিশেষ শর্তে শিক্ষক ও বিজ্ঞানীদের নমুনা ব্যবহারের সুযোগ দেয়। জনসন স্পেস সেন্টারে ৫ থেকে ৭ ঘণ্টার বিশেষ প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্লাস্টিকে মোড়ানো নমুনা ধার দেওয়া হয়। গবেষণা শেষে অবশিষ্ট অংশ ফেরত দিতে হয় এবং তা আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা হয়।
নাসার বিশেষজ্ঞ ও অ্যাপোলো রিমাস্টারড বইয়ের লেখক অ্যান্ডি সন্ডার্স জানিয়েছেন, এই পাথরগুলো এখনো গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০২২ সালে অ্যাপোলো ১৭ মিশনের একটি নমুনা প্রথমবারের মতো খোলা হয়, যা প্রায় ৫০ বছর সিল অবস্থায় ছিল। এর মাধ্যমে এখনো নতুন বৈজ্ঞানিক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
সিএ/এমআর


