ডিপফেক প্রযুক্তি এখন আর শুধু ছবি বা ভিডিও বিকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি পরিণত হয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ জেনারেটিভ মিডিয়া ইকোসিস্টেমে। আধুনিক ডিপফেক সিস্টেমে ডিফিউশন মডেল, ট্রান্সফরমারভিত্তিক আর্কিটেকচার ও উন্নত ভয়েস সিন্থেসিসের মাধ্যমে এমন বাস্তবধর্মী কনটেন্ট তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে, যা সাধারণ দর্শকের জন্য সত্য-মিথ্যা আলাদা করা ক্রমেই কঠিন করে তুলছে। কয়েক মিনিটের অডিও স্যাম্পল ব্যবহার করে কণ্ঠস্বর নকল করা কিংবা অল্প কয়েকটি পরিষ্কার ছবি দিয়েই মুখ প্রতিস্থাপন বা ফেস রিএনাক্টমেন্ট ভিডিও বানানো এখন তুলনামূলকভাবে সহজ।
নির্বাচনের মতো সংবেদনশীল প্রক্রিয়ায় এই প্রযুক্তির ঝুঁকি কেবল ভুয়া ভিডিও তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিপফেক এখন একটি পরিকল্পিত তথ্যপ্রবাহ কৌশলের অংশ। সাধারণত এ ধরনের অভিযানে নির্দিষ্ট ভোটারগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে আবেগনির্ভর বিভ্রান্তিকর বার্তা তৈরি করা হয়, যা দ্রুত ভাইরাল হয়ে নির্বাচন ও প্রার্থীদের প্রতি আস্থায় ফাটল ধরাতে পারে। এখানে ভুলতথ্য ও অপতথ্য একসঙ্গে কাজ করে—একটি অনিচ্ছাকৃতভাবে ছড়ায়, অন্যটি কৌশলগতভাবে ছড়ানো হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ঝুঁকি আরও প্রকট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর জনমত গঠন, সীমিত ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং দ্রুত শেয়ার করার প্রবণতা—এই তিনটি বিষয় মিলিয়ে ডিপফেক একটি কম খরচের কিন্তু উচ্চ-প্রভাবসম্পন্ন হুমকিতে পরিণত হতে পারে। বিশেষ করে ভোটের আগের ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা সময়কে বিশেষজ্ঞরা ‘লেট-স্টেজ ন্যারেটিভ ইনজেকশন উইন্ডো’ হিসেবে দেখছেন, যখন যাচাই বা প্রতিক্রিয়ার সময় খুবই সীমিত থাকে।
প্রযুক্তিগত শনাক্তকরণেও চ্যালেঞ্জ কম নয়। ফ্রিকোয়েন্সি অ্যানালাইসিস, ফেসিয়াল অস্বাভাবিকতা বা ভয়েস স্পেকট্রাম বিশ্লেষণের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে ডিপফেক শনাক্ত করা গেলেও, জেনারেশন প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতির সঙ্গে শনাক্তকরণ প্রযুক্তি এক ধরনের অস্ত্র প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ব্যবহারকারীর সচেতন আচরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা স্তর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সন্দেহজনক কনটেন্ট যাচাই ছাড়া শেয়ার না করা, উৎস ও সময় পরীক্ষা করা এবং রিভার্স ইমেজ সার্চের মতো টুল ব্যবহার করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি—দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা, অফিসিয়াল ব্যাখ্যার নির্ভরযোগ্য চ্যানেল এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক তথ্য সুরক্ষা কৌশল।
ডিপফেকের যুগে নির্বাচন নিরাপত্তা শুধু প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর বিষয় নয়; এটি তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা ও ধারাবাহিকতা রক্ষার লড়াই। প্রযুক্তি যতই এগোক, গণতন্ত্র টিকে থাকবে মানুষের সচেতনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির ওপরই।
সিএ/এমআর


