বিষুবরেখার যত কাছাকাছি যাওয়া যায়, প্রজাপতির ডানার নকশায় তত দ্রুত ও বৈচিত্র্যময় পরিবর্তন দেখা যায়—এমন তথ্য উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক গবেষণায়। গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের প্রজাপতিরা তুলনামূলকভাবে অল্প সময়ের মধ্যেই একই ধরনের ডানার নকশা গ্রহণ করতে সক্ষম হয়। এই গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রির গবেষক কিথ উইলমট, যিনি কয়েক দশক ধরে অ্যাডেলফা নামের একটি প্রজাপতি গোষ্ঠী নিয়ে কাজ করছেন।
গবেষণার সময় অ্যাডেলফা প্রজাপতির মধ্যে একটি ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা হয়। একই প্রজাতির প্রজাপতির ডানায় ভিন্নতা থাকতে পারে, আবার সম্পূর্ণ আলাদা প্রজাতির দুটি প্রজাপতি দেখতে প্রায় অভিন্নও হতে পারে। স্মিথসোনিয়ান ট্রপিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের কীটতত্ত্ববিদ অ্যানেট আইয়েলো জানিয়েছেন, এই বাহ্যিক সাদৃশ্যের কারণে দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা এদের সঠিক শ্রেণিবিন্যাস করতে গিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েছিলেন। নতুন বিবর্তনীয় মানচিত্র সেই জটিলতা অনেকটাই দূর করেছে।
সাধারণভাবে উজ্জ্বল রঙের প্রজাপতিকে বিষধর ধরে নিয়ে শিকারিরা এড়িয়ে চলে। তবে অনেক অ্যাডেলফা প্রজাপতি বিষধর না হয়েও একই ধরনের উজ্জ্বল নকশা ধারণ করে। গবেষকদের মতে, এটি শিকারিদের জন্য এক ধরনের সতর্ক সংকেত। এসব প্রজাপতির দ্রুত ও এলোমেলো ওড়ার ভঙ্গি শিকারি পাখিকে ক্লান্ত করে তোলে। ফলে একাধিকবার ব্যর্থ হওয়ার পর শিকারি আর শক্তি নষ্ট করতে চায় না। এর ফল হিসেবে একই এলাকায় বসবাসকারী বিভিন্ন প্রজাতির প্রজাপতি একই নকশা ধারণ করে, যাতে শিকারিরা দ্রুত বুঝে নেয়—এই রঙের প্রজাপতি ধরা সময়ের অপচয়।
ক্রান্তীয় আমেরিকায় অধিকাংশ অ্যাডেলফা প্রজাপতি তিনটি প্রধান নকশার মধ্যে সীমাবদ্ধ। একটি নকশায় গাঢ় অ্যাম্বার রঙের ডানার ওপর সাদা রেখা ও উজ্জ্বল কমলা ব্যান্ড দেখা যায়। দ্বিতীয় নকশায় কমলার জায়গায় চওড়া সাদা ব্যান্ড থাকে। তৃতীয় নকশাটি মূলত কমলা রঙের তির্যক রেখার ওপর নির্ভরশীল।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বিষুবরেখার কাছাকাছি এলাকায় প্রজাপতির নকশা পরিবর্তনের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো বা নেভাদার মতো উত্তরাঞ্চলে এই পরিবর্তন অনেক ধীরগতির। গবেষকদের মতে, বিষুবীয় অঞ্চলের স্থিতিশীল আবহাওয়া এবং সারা বছর ধরে শিকারি ও শিকারের তীব্র মিথস্ক্রিয়া এই বিবর্তনকে দ্রুততর করে। ১৮৭৮ সালে বিজ্ঞানী আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস যে দাবি করেছিলেন—বিষুবীয় অঞ্চল জীববৈচিত্র্যের জন্য সবচেয়ে অনুকূল—প্রজাপতির ডানার নকশা সেই ধারণাকেই সমর্থন করছে।
নতুন গবেষণায় ছয়টি পার্বত্য প্রজাতির প্রজাপতি শনাক্ত করা হয়েছে, যেগুলো দেখতে অ্যাডেলফার মতো হলেও জিনগতভাবে ভিন্ন। এ কারণে তাদের জন্য অ্যাডেলফিনা নামে একটি নতুন জেনাস নির্ধারণ করা হয়েছে। এই গবেষণা প্রজাপতির বিবর্তন ও বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্যের গভীর সম্পর্ক তুলে ধরেছে।
সিএ/এমআর


