একসময় প্রযুক্তি বলতে শুধু যন্ত্রকেই বোঝানো হতো। সময়ের সঙ্গে সেই ধারণা আমূল বদলে গেছে। এখন প্রযুক্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ, কখনো সহকারী, কখনো সহকর্মী, আবার কখনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের সহায়ক। ঘুম ভাঙা থেকে শুরু করে কাজ, চিকিৎসা, শিক্ষা, কেনাকাটা—সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির প্রভাব দিন দিন গভীর হচ্ছে। এই পরিবর্তন আর ধীরগতির নয়; বরং দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক বছরে এমন কিছু প্রযুক্তি সামনে আসবে, যা শুধু কাজের ধরন নয়, মানুষের চিন্তাভাবনার ভাষাও পাল্টে দেবে। কেমব্রিজ ওপেন একাডেমির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালে আটটি প্রযুক্তিপ্রবণতা সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: সহকারী থেকে সহযাত্রী
২০২৫ সাল থেকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিনিয়োগ বেড়েছে কয়েক গুণ এবং দৈনন্দিন জীবনে এআইয়ের উপস্থিতিও বিস্তৃত হয়েছে। ২০২৬ সালে এআই আরও বেশি ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করবে। এসব সহকারী ব্যবহারকারীর অভ্যাস ও প্রয়োজন বুঝে আগেভাগে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে। ফলে কাজ হবে আরও দ্রুত, সহজ ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক।
কোয়ান্টাম কম্পিউটিং: গণনার সীমা ভাঙার পথে
সাধারণ কম্পিউটার যেখানে বিটের মাধ্যমে কাজ করে, সেখানে কোয়ান্টাম কম্পিউটার ব্যবহার করে কিউবিট, যা একসঙ্গে একাধিক অবস্থায় থাকতে পারে। এই সুপার পজিশনের কারণে কোয়ান্টাম কম্পিউটার অত্যন্ত জটিল হিসাব মুহূর্তের মধ্যে করতে সক্ষম। যদিও প্রযুক্তিটি এখনো বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবে ২০২৬ সালকে বড় কোনো অগ্রগতির সম্ভাবনাময় সময় হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। উপাদান বিজ্ঞান, ওষুধ আবিষ্কার ও আর্থিক বিশ্লেষণে এর প্রভাব পড়তে শুরু করবে।
এক্সটেন্ডেড রিয়েলিটি: বাস্তব ও ভার্চুয়ালের মেলবন্ধন
এক্সটেন্ডেড রিয়েলিটি বা এক্সআর বাস্তব ও ভার্চুয়াল জগতের সীমারেখা মুছে দিচ্ছে। এর আওতায় রয়েছে অগমেন্টেড রিয়েলিটি ও ভার্চুয়াল রিয়েলিটি। বাস্তব জগতের ওপর ডিজিটাল তথ্য বসানো কিংবা সম্পূর্ণ কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি—দুটিই এক্সআর-এর অংশ। গবেষণা বলছে, ২০২৬ সালের মধ্যে এই প্রযুক্তি দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক উপাদান হয়ে উঠবে। ঘরে বসেই ভার্চুয়াল কনসার্ট বা ইভেন্ট উপভোগ করা সম্ভব হবে।
বায়োপ্রিন্টিং: চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা
জীবন্ত কোষ ও বায়োম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করে মানবদেহের টিস্যু বা অঙ্গ তৈরি করার প্রযুক্তিই বায়োপ্রিন্টিং। থ্রিডি বায়োপ্রিন্টিংয়ের মাধ্যমে ইতোমধ্যে মানব টিস্যু তৈরির পরীক্ষা চলছে। ২০২৬ সালে এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতির সম্ভাবনা রয়েছে। ভবিষ্যতে ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যুর বদলে নতুন টিস্যু কিংবা সম্পূর্ণ অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হতে পারে, যা অঙ্গদানের দীর্ঘ অপেক্ষা কমিয়ে দিতে পারে।
সাইবার নিরাপত্তা: নতুন হুমকি, নতুন প্রস্তুতি
প্রযুক্তিনির্ভরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার হামলার ঝুঁকিও বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬ সালে আরও সংগঠিত ও জটিল সাইবার হামলা দেখা যেতে পারে। বিদ্যুৎব্যবস্থা, ব্যাংকিং পরিকাঠামো, করপোরেট নেটওয়ার্ক থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত তথ্য—সবই ঝুঁকির মধ্যে থাকবে। ফলে সাইবার নিরাপত্তা শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, জাতীয় ও সামাজিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে।
ইন্টারনেট অব থিংস: সংযুক্ত বিশ্বের বিস্তার
ইন্টারনেট অব থিংস এমন এক নেটওয়ার্ক, যেখানে দৈনন্দিন ব্যবহারের যন্ত্রপাতি ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত থাকে। স্মার্ট ফ্রিজ, ফিটনেস ডিভাইস, সংযুক্ত গাড়ি কিংবা শিল্পকারখানার যন্ত্র—সবই এই নেটওয়ার্কের অংশ। ২০২৬ সালে এসব ডিভাইসের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বাড়বে। সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে তৈরি হবে আরও বুদ্ধিমান ও দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা।
স্মার্ট সিটি: প্রযুক্তিনির্ভর নগর জীবন
স্মার্ট সিটি এমন একটি ধারণা, যেখানে প্রযুক্তির মাধ্যমে নগরজীবনকে আরও সহজ ও টেকসই করা হয়। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ, আবর্জনা ব্যবস্থাপনা—সবকিছুই বুদ্ধিমান সিস্টেমের আওতায় থাকে। সেন্সরের মাধ্যমে সমস্যা শনাক্ত করে তাৎক্ষণিক সমাধান নেওয়া সম্ভব হয়। পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষা ও শক্তি সাশ্রয় স্মার্ট সিটির অন্যতম লক্ষ্য।
হাইপার অটোমেশন: কাজের ধরনে আমূল পরিবর্তন
হাইপার অটোমেশন শুধু একটি কাজ স্বয়ংক্রিয় করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রোবোটিক প্রসেস অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিংয়ের সমন্বয়ে পুরো ব্যবসায়িক প্রক্রিয়াই স্বয়ংক্রিয় হয়ে উঠছে। এতে কাজ হবে আরও দ্রুত ও নির্ভুল। একই সঙ্গে এই পরিবর্তন নতুন ধরনের দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করছে।
সিএ/এসএ


