ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক জীবনব্যবস্থা, যেখানে মানবিকতা, সহানুভূতি ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধকে ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। একজন মুসলিমের ঈমান কেবল নামাজ-রোজার মধ্যেই প্রকাশ পায় না, বরং অপর মুসলিমের প্রতি তার আচরণ, সহযোগিতা, ন্যায়বোধ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমেও প্রতিফলিত হয়।
ইসলামের দৃষ্টিতে মুসলিম সমাজ একটি ভ্রাতৃত্বপূর্ণ বন্ধনে আবদ্ধ। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলিমদের পারস্পরিক সম্পর্ক ও দায়িত্ববোধের একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা তুলে ধরেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ لاَ يَظْلِمُهُ وَلاَ يُسْلِمُهُ وَمَنْ كَانَ فِي حَاجَةِ أَخِيهِ كَانَ اللهُ فِي حَاجَتِهِ وَمَنْ فَرَّجَ عَنْ مُسْلِمٍ كُرْبَةً فَرَّجَ اللهُ عَنْهُ كُرْبَةً مِنْ كُرُبَاتِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَمَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
‘মুসলিম মুসলিমের ভাই।
সে তার ওপর জুলুম করবে না এবং তাকে যালিমের হাতে সোপর্দ করবে না। যে কেউ তার ভাইয়ের অভাব পূরণ করবে, আল্লাহ তার অভাব পূরণ করবেন। যে কেউ তার মুসলিম ভাইয়ের বিপদ দূর করবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার বিপদসমূহ দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ ঢেকে রাখবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ ঢেকে রাখবেন।
এই হাদিস মুসলিম সমাজের চারটি মৌলিক ভিত্তিকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। প্রথমত, ভ্রাতৃত্বের বন্ধন। মুসলিম মুসলিমের ভাই—এই ঘোষণার মাধ্যমে ঈমানের সম্পর্ককে রক্তের সম্পর্কের চেয়েও গভীর ও শক্তিশালী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কোনো মুসলিম অন্য মুসলিমের ওপর জুলুম করতে পারে না এবং অন্যায়ের মুখে তাকে একা ছেড়ে দিতেও পারে না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকা বা অন্যকে যালিমের হাতে সোপর্দ করাও এই ভ্রাতৃত্ববোধের পরিপন্থী।
দ্বিতীয়ত, পারস্পরিক সহযোগিতার গুরুত্ব। যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণে এগিয়ে আসে, আল্লাহ তাআলা তার প্রয়োজন পূরণের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এটি শুধু দুনিয়াবি সহায়তার প্রতিদান নয়, বরং আখিরাতের কল্যাণেরও সুসংবাদ বহন করে।
তৃতীয়ত, বিপদ লাঘবের ফজিলত। দুনিয়ায় কোনো মুসলিমের কষ্ট বা বিপদ দূর করা কিয়ামতের ভয়াবহ দিনের বিপদ থেকে মুক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মানুষের কষ্ট লাঘব করা যে আল্লাহর কাছে কতটা প্রিয় আমল, এই হাদিস তার স্পষ্ট প্রমাণ দেয়।
চতুর্থত, দোষ গোপনের শিক্ষা। ইসলাম মানুষের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করতে চায়। কারো দোষ প্রকাশ করে তাকে অপমান করা নয়; বরং সংশোধনের নিয়তে দোষ আড়াল করাই ঈমানের পরিচয়। এর বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন বান্দার এমন দোষসমূহ আড়াল করবেন, যা প্রকাশ পেলে তার জন্য কঠিন পরিণতি ডেকে আনতে পারত।
সার্বিকভাবে এই হাদিস মুসলিম সমাজকে এমন এক নৈতিক উচ্চতায় পৌঁছানোর আহ্বান জানায়, যেখানে প্রতিটি মানুষ অপরের নিরাপত্তা, সম্মান ও কল্যাণের দায়িত্ব নিজের কাঁধে বহন করবে এবং এর প্রতিদান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই নিশ্চিত হবে।
সিএ/এমআর


