মদিনার পবিত্র ভূমিতে প্রথম আজানের ধ্বনি যখন প্রতিধ্বনিত হয়েছিল, তখন থেকেই মসজিদ ছিল কেবল নামাজ বা ইবাদতের কেন্দ্র নয়। এটি ছিল একটি সমাজ ও জাতি গঠনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র এবং জনসচেতনতা তৈরির প্রাণকেন্দ্র। মসজিদের মিম্বর ছিল সত্যের কণ্ঠস্বর, কোরআনের দরস ছিল জ্ঞানের আলো, আর আঙিনাটি সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সমাধানের স্থান হিসেবে কাজ করত।
নবীজির (সা.) জীবনচরিত থেকে জানা যায়, মসজিদ কেবল নামাজের স্থান নয়, বরং একটি সমন্বিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে জ্ঞানচর্চা, প্রশাসন ও সামাজিক সেবার কেন্দ্র ছিল। মসজিদে নববী একটি আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কাজ করতেন, যেখানে সাহাবায়ে কেরাম কোরআন, ফিকহ ও উন্নত জীবনদর্শন শিখতেন। সুরা তওবায় আল্লাহ তাআলা বলেছেন, যারা আল্লাহর মসজিদকে আবাদ করে হিদায়াত ছড়ায়, তাদের প্রশংসা করা হয়েছে।
মসজিদ প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। ইসলামি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রতিরক্ষা কৌশল নির্ধারণ এবং বিদেশি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক সবই মসজিদের আঙিনায় হতো। এছাড়া মসজিদে ‘আহলুস সুফফাহ’ নামে স্থান ছিল, যেখানে নিঃস্ব ও অসহায় মানুষরা আশ্রয় পেত।
আজকের দিনে মসজিদের এই ঐতিহাসিক ভূমিকা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। তরুণ প্রজন্ম মসজিদের খুতবার পরিবর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। অনেক মসজিদের খুতবা কেবল আনুষ্ঠানিক বিষয়েই সীমাবদ্ধ, যা সমকালীন বিশ্বের জটিল সমস্যাগুলো যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি, বিজ্ঞানকে অন্তর্ভুক্ত করে না। এছাড়া ডিজিটাল মিডিয়ার প্রভাবও মসজিদের মূল উদ্দেশ্যকে সীমিত করে দিয়েছে।
হারানো ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের জন্য মসজিদকে জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলোতে খুতবা ও আলোচনার মাধ্যমে আধুনিকায়ন করতে হবে। সামাজিক দায়বদ্ধতা বাড়াতে মসজিদে অবৈতনিক শিক্ষা কেন্দ্র, পরামর্শ কেন্দ্র বা লাইব্রেরি গড়ে তোলা যেতে পারে। তরুণদের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের সুযোগ দিলে তারা মসজিদকে নিজেদের প্রতিষ্ঠান হিসেবে অনুভব করবে। বড় মসজিদগুলো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তাদের বার্তা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে পারে। ইমাম ও খতিবদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে আধুনিক জ্ঞান ও সমকালীন সমস্যার মোকাবেলা করার ক্ষমতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে।
মসজিদের মিম্বর থেকে ন্যায়বিচার, সততা ও জনকল্যাণের বার্তা দিলে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে সরাসরি প্রভাব পড়ে। ইসলামে সমাজসংস্কারের প্রথম ধাপ হলো মানুষের চিন্তার পরিবর্তন। মসজিদ মানুষের মধ্যে তাকওয়া জাগিয়ে একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। মসজিদের পূর্ণ শক্তি ফিরে পেলে এটি কেবল মুসল্লিদের নয়, গোটা মানবজাতির জন্য কল্যাণ ও দিকনির্দেশনার কেন্দ্র হবে।
সিএ/এমআর


