কোরআন কেবল একটি কিতাব নয়; এটি মানবজাতির জন্য ‘শিফা’ বা মহৌষধ। জীবন ও জগতের প্রতিটি বাঁকে মানুষ রোগ-ব্যাধি, দুঃখ-কষ্ট বা আধ্যাত্মিক সংকটের সম্মুখীন হয়। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য ইসলাম কেবল পার্থিব চিকিৎসার ওপর নির্ভর করেনি; বরং আধ্যাত্মিক ও ঐশ্বরিক আরোগ্যের একটি বিশেষ পদ্ধতি শিখিয়েছে, যা রুক্ইয়া নামে পরিচিত।
রুক্ইয়া মূলত মহান আল্লাহর কালাম এবং তাঁর শিখিয়ে দেওয়া দোয়ার মাধ্যমে আরোগ্য ও নিরাপত্তা লাভের বৈধ মাধ্যম। প্রখ্যাত গবেষক আলি সাল্লাবি লিখেছেন, রুক্ইয়া হলো মুমিনের জন্য শক্তিশালী ঢাল, যা তাকে জাদুটোনা, বদনজর ও বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক ব্যাধি থেকে রক্ষা করে।
আভিধানিক অর্থে ‘রুক্ইয়া’ মানে হলো ঝাড়ফুঁক বা মন্ত্রপূতকরণ। পরিভাষায়, পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর ভাষ্য দ্বারা রোগের চিকিৎসা বা অমঙ্গল থেকে রক্ষা প্রার্থনা করাকেই রুক্ইয়া বলা হয়। ইমাম ইবনুল আসিরের মতে, এটি আশ্রয় প্রার্থনা বা সুরক্ষা কবচ, যার মাধ্যমে জ্বরাক্রান্ত, মৃগীরোগী বা বিপদগ্রস্ত মানুষের চিকিৎসা করা হয়।
রুক্ইয়ার মূল ভিত্তি হলো মহান আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও তাওয়াক্কুল। এটি কোনো জাদুকরি প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি একটি ইবাদত। মুমিন স্বীকার করে যে আরোগ্য দানের একমাত্র মালিক আল্লাহ এবং কোরআন কেবল একটি কিতাব নয়, বরং মানবজাতির জন্য ‘শিফা’। (সুরা ইসরা, আয়াত: ৮২)
কোরআন থেকে সুরক্ষার সূত্রের মধ্যে বিশেষ কিছু সুরা ও আয়াতের ব্যবহার হাদিসে উল্লেখ আছে।
১. সুরা ফাতিহা ও ছোট তিন সুরা
সুরা ফাতিহাকে বলা হয় ‘সুরাতুশ শিফা’ বা আরোগ্যের সুরা। এছাড়া সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাসও গুরুত্বপূর্ণ। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) অসুস্থ থাকলে তিনি নিজেই সুরা ফালাক ও নাস পাঠ করে ফুঁ দিতেন এবং আয়েশা (রা.) তা পাঠ করে হাত বুলিয়ে দিতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০১৭)
২. সুরা বাকারার শেষাংশ ও আয়াতুল কুরসি
শয়তানের প্রভাব ও জাদুটোনা থেকে ঘরকে মুক্ত রাখতে সুরা বাকারার পাঠ কার্যকর। রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে ঘরে সুরা বাকারার পাঠ করা হয়, সেখান থেকে শয়তান পালিয়ে যায়।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৮০) বিশেষ করে আয়াতুল কুরসি (বাকারা, আয়াত: ২৫৫) শোয়ার সময় পাঠ করলে সারা রাত আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রক্ষক থাকে। এছাড়া হারুত-মারুত সংক্রান্ত আয়াতও জাদুর প্রভাব কাটাতে ব্যবহৃত হয়। (বাকারা, আয়াত: ১০২)
৩. অন্যান্য আরোগ্যদায়ক আয়াত
সুরা ইউনুসে বলা হয়েছে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ক্ষতি দূর করতে সক্ষম নয়। (সুরা ইউনুস, আয়াত: ১০৭) সুরা ইসরা, আয়াত: ৮১, এবং সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ২৬ ও ২৭, রুক্ইয়ার সময় পাঠ করা অত্যন্ত ফলদায়ক।
রুক্ইয়ার বৈধতা ও শর্তাবলি
ইসলামে ঝাড়ফুঁক বা রুক্ইয়া বৈধ হবে, যদি তা তিনটি শর্ত পূরণ করে। আবদুল আজিজ ইবনে বাজ (রহ.) বলেন:
- এটি আল্লাহর কালাম, নাম বা গুণাবলি দ্বারা হতে হবে।
- এটি বোধ্য ভাষায় বা আরবি ভাষায় হতে হবে।
- রুক্ইয়া নিজে আরোগ্য দিতে পারে না; আল্লাহর ইচ্ছাতেই তা কার্যকর হয়। (মাজমুউ ফাতাওয়া ওয়া মাকালাত, ৮/৩১৫)
নবীজি (সা.) বলেছেন, “ঝাড়ফুঁক করাতে কোনো দোষ নেই, যতক্ষণ না তা শিরকের সঙ্গে যুক্ত।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২০০) তাই শিরকযুক্ত মন্ত্র বা নকশা ইসলামিক রুক্ইয়ায় অনুমোদিত নয়।
সিএ/এমআর


