ভারতের দার্জিলিং জেলার মংপু অঞ্চলে অবস্থিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত একটি বাড়ি আজ পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। তবে ইতিহাস বলছে, বাংলাদেশে ম্যালেরিয়ার প্রভাব না থাকলে এই বাড়িটি হয়তো কখনোই রবীন্দ্রপ্রেমীদের ভ্রমণতালিকায় স্থান পেত না।
কালিম্পং থেকে যাত্রা করে পাহাড়ি পথ পেরিয়ে মংপুতে পৌঁছালে দেখা মেলে মৈত্রেয়ী দেবীর সেই বাড়ির, যা বর্তমানে জাদুঘর হিসেবে পরিচিত। পথজুড়ে পাইনের সারি, আঁকাবাঁকা রাস্তা আর প্রকৃতির সৌন্দর্য ভ্রমণকে করে তোলে স্মরণীয়। এই পথেই একাধিকবার যাতায়াত করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
মংপুতে সিনকোনা গাছের চাষ শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে, মূলত ম্যালেরিয়ার ওষুধ কুইনাইন তৈরির জন্য। স্কটিশ উদ্ভিদবিজ্ঞানী টমাস অ্যান্ডারসনের উদ্যোগে শুরু হওয়া এই চাষ পরবর্তীতে বাণিজ্যিক রূপ পায়। সেই সূত্রেই এখানে আসেন মনমোহন সেন, যিনি কুইনাইন কারখানার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সঙ্গেই বিয়ে হয় লেখিকা মৈত্রেয়ী দেবীর।
এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের কারণেই গড়ে ওঠে মংপুর সেই বাড়ি, যেখানে রবীন্দ্রনাথ একাধিকবার অবস্থান করেন। প্রথমে সুরেল বাংলোতে থাকার ব্যবস্থা থাকলেও পরে মৈত্রেয়ীর বাসভবনেই থাকতে আগ্রহ প্রকাশ করেন কবি।
বাড়িটির প্রাকৃতিক পরিবেশ কবিকে মুগ্ধ করেছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘এত চমৎকার বাড়ি!…কী সুন্দর এই সামনের ঢালু পাহাড়টি, আকাশের কোল থেকে সবুজ বন্যা নেমে এসেছে। এই সামনের মাঠটিও তোমার ভালো, আমি মাটির কাছাকাছিই থাকতে চাই,…এ চৌকিতে সকালবেলা বসব আর রোদ্দুর এসে পড়বে কাচের ভেতর দিয়ে।—তোমার ঐ বনস্পতির পাতার ফাঁক দিয়ে শতধারায় ঝরে পড়বে সকালবেলার আলো, ভোরের সেই রৌদ্রস্নানটি আমার কত সুন্দর হবে।’
বর্তমানে জাদুঘরটিতে সংরক্ষিত রয়েছে কবির ব্যবহৃত আসবাব, আঁকা ছবি, পাণ্ডুলিপি এবং ব্যক্তিগত নানা স্মারক। ঘরের ভেতর রবীন্দ্রসংগীতের সুর দর্শনার্থীদের এক ভিন্ন আবহে নিয়ে যায়।
প্রকৃতির স্নিগ্ধ পরিবেশে ঘেরা এই বাড়িটি আজ ইতিহাস, সাহিত্য ও প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এক অনন্য গন্তব্য হয়ে উঠেছে।
সিএ/এমআর


