মাত্র ৫০০ ডলার পকেটে নিয়ে ১৯৯৮ সালে ইংল্যান্ডের ইস্ট ইয়র্কশায়ারের হাল শহর থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন কার্ল বুশবি। সঙ্গে ছিল এক অদ্ভুত দৃঢ় অঙ্গীকার—পৃথিবী পুরো হেঁটে ঘুরে না ফেলা পর্যন্ত তিনি বাড়ি ফিরবেন না। তখন বয়স ছিল ২৯।
আজ বয়স ৫৬, আর তিনি ২৭ বছর ধরে হেঁটে চলেছেন পৃথিবীজুড়ে। এই অভিযানের নাম তিনি দিয়েছেন ‘গোলিয়াথ অভিযান’। এ অভিযানে কোনো মোটরচালিত যান ব্যবহার করা যায়নি এবং কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাড়ি ফেরা যায়নি।
ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে প্যারাট্রুপার হিসেবে ১২ বছর চাকরি করার পর বুশবির মনে হয়েছিল, জীবন যেন একধরনের শৃঙ্খলে আবদ্ধ। একঘেয়েমি ও সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তাকে পৃথিবী ঘুরতে প্রলুব্ধ করে। মানচিত্রে রেখা এঁকে তিনি নির্ধারণ করেছিলেন ইংল্যান্ড থেকে ইউরোপ, এশিয়া, সাইবেরিয়া পেরিয়ে বেরিং প্রণালি হয়ে আমেরিকা, তারপর আবার বাড়ি ফেরা। যাত্রা শুরু হয়েছিল চিলির পুন্তা আরেনাস থেকে, প্রতিদিন গড়ে ৩০ কিলোমিটার হেঁটে চলেছেন।
এই দীর্ঘ যাত্রায় বুশবি জঙ্গল, বরফ আর মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন। দক্ষিণ আমেরিকার দারিয়েন গ্যাপ, কলম্বিয়া ও পানামার দুর্গম জঙ্গল পাড়ি দিতে হয়, যেখানে অপরাধী চক্র, জলাভূমি ও বিষাক্ত প্রাণীর ভয় সব সময় তাড়া করে। সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় আসে ২০০৬ সালের মার্চে। আলাস্কা থেকে রাশিয়ার সাইবেরিয়া বরফে জমে থাকা বেরিং প্রণালি পেরোনোর সময় ১৪ দিন ও ১৪ রাত বরফের ওপর যুদ্ধের মতো সংগ্রাম করেছেন ফরাসি অভিযাত্রী দিমিত্রি কিফারের সঙ্গে। রাশিয়ায় পৌঁছার পর তাঁকে আটক করা হয়, জেরা শেষে বহিষ্কার করা হয় এবং পাঁচ বছরের জন্য রাশিয়ায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়।
অভিযাত্রার খরচ এসেছে মূলত স্পনসরশিপ, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ ও মানুষের সহায়তা থেকে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে মেক্সিকো ও কলম্বিয়ায় বছরের পর বছর আটকে পড়েন। টাকার অভাবে কখনো কুকুরের মল পরিষ্কার করেছেন, কখনো অন্যের কুকুর হাঁটিয়েছেন শুধু খাবারের বিনিময়ে। ২০০৫ সালে প্রকাশিত তাঁর বই ‘জায়ান্ট স্টেপস’ থেকেও কিছু অর্থ সাহায্য এসেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক জটিলতার কারণে ইরান বা রাশিয়া হয়ে ভ্রমণ অসম্ভব হলে তিনি কাস্পিয়ান সাগর সাঁতরে পার হয়েছেন। টানা ৩১ দিন সাঁতরে তিনি ও তাঁর সঙ্গী সমুদ্র পার হয়েছেন কোনো জাহাজ বা বিমানের সাহায্য ছাড়াই।
সর্বোচ্চ ত্যাগ করেছে পরিবারকে। ১৯৯৮ সালে যাত্রা শুরু করার সময় তার ছেলে অ্যাডাম ছিল স্কুলপড়ুয়া। ২৭ বছর ধরে ছেলের পুরো শৈশব মিস করেছেন। এখন ছেলের নিজের পরিবার রয়েছে, কিন্তু কার্ল এখনও নাতি-নাতনিকে কোলে তুলতে পারেননি। বিনিময়ে তিনি পেয়েছেন অচেনা মানুষের ভালোবাসা এবং নিঃস্বার্থ সহায়তা। এ বছরের কোনো একসময় তিনি নিজের শহরে ফিরবেন এবং শেষ হবে তার গোলিয়াথ অভিযান।
সিএ/এসএ


