ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। ইশতেহারে দলটি নয়টি প্রধান প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরেছে, যার মধ্যে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর ঘোষণা অন্যতম।
আজ শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর) বিকেলে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইশতেহার ঘোষণা করা হয়। অনুষ্ঠানে বিএনপির শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। ইশতেহারে অর্থনীতি, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ক্রীড়া, পরিবেশ, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও ডিজিটাল সংযোগ—এই নয়টি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
ইশতেহারে বলা হয়েছে, প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। এই আর্থিক সহায়তার পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বাড়ানোর কথাও উল্লেখ করা হয়।
কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে ভর্তুকি, সহজ ঋণ, কৃষি বীমা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ জোরদারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। একই সুবিধার আওতায় মৎস্যচাষি, পশুপালনকারী খামারি ও কৃষিখাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও অন্তর্ভুক্ত থাকবেন বলে জানানো হয়।
স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা, মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা এবং রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিষয়টিও ইশতেহারে উল্লেখ রয়েছে।
শিক্ষা ব্যবস্থাকে আনন্দময় ও কর্মমুখী করতে বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হবে বলে জানিয়েছে বিএনপি। প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সহায়তা বৃদ্ধি এবং ‘মিড-ডে মিল’ চালুর প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা এবং বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। পাশাপাশি মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করার অঙ্গীকারও করা হয়েছে।
ক্রীড়াকে পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ১০ হাজার কিলোমিটার নদী–খাল খনন ও পুনঃখনন, পাঁচ বছরে ১৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালুর কথা বলা হয়েছে।
ইশতেহারে আরও বলা হয়েছে, ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালু করা হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সংযোগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম পেপাল চালু, ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব স্থাপন এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
বিএনপি বলছে, এই ইশতেহার কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা। বিএনপি প্রতিশোধ নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকারই বিএনপির রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। লুটপাট নয়, উৎপাদন; ভয় নয়, অধিকার; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা—এই নীতিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে।
দলটি আরও জানায়, জনগণের রায়ে দায়িত্ব পেলে তারা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলবে, যেখানে ভোটের মর্যাদা থাকবে, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসান হবে এবং আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকবে না। প্রতিটি নাগরিক গর্ব করে বলতে পারবে, সবার আগে বাংলাদেশ।
সিএ/এমই


