ভোটের মাঠে আবেগ কম, হিসাবই বেশি
জাতীয় নেতা, স্থানীয় প্রার্থী ও আঞ্চলিক সমীকরণে কক্সবাজারের চারটি সংসদীয় আসনে এবারের ভোটের চিত্র দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে। পর্যটননির্ভর এই উপকূলীয় জেলায় ভোটারদের সিদ্ধান্তে আবেগের চেয়ে বাস্তব হিসাবই বেশি প্রভাব ফেলছে বলে মাঠপর্যায়ের আলোচনায় স্পষ্ট হচ্ছে।
সকালে কক্সবাজার শহরের কলাতলী মোড়ে একটি চায়ের দোকানে বসে কথা হয় কয়েকজন ভোটারের সঙ্গে। সাগরের ঢেউয়ের শব্দ আর সকালের নরম রোদে দাঁড়িয়ে ভোটের প্রসঙ্গ তুলতেই মাঝবয়সী এক ব্যক্তি বলেন, ভোট তো হবে, তবে এবার হিসাবটা একটু আলাদা। ওই ভোটারের নাম মো. মোস্তফা। তিনি শহরের সমিতিপাড়ার বাসিন্দা। তাঁর কথাবার্তায় আবেগ নয়, বরং বাস্তব বিবেচনার ইঙ্গিত স্পষ্ট। কী ধরনের হিসাব, তা তিনি সরাসরি না বললেও ইঙ্গিত দেন আসন্ন নির্বাচনে ভোটাররা অনেক কিছু ভেবে সিদ্ধান্ত নেবেন।
গত রোববার (৭ ডিসেম্বর) কক্সবাজারে পৌঁছে পরবর্তী কয়েক দিনে জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে একই চিত্র বারবার সামনে এসেছে। ভোটারদের মুখে জোরালো রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়ে প্রশ্ন বেশি—আগামী পাঁচ বছরে তাঁরা কী পাবেন। বিশেষ করে তরুণ ভোটাররা দলীয় পরিচয় বা প্রতীকের চেয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও বাস্তব সুফলের দিকেই নজর দিচ্ছেন।
চার আসনে চার রকম বাস্তবতা
পাহাড়, নদী, সাগর ও সীমান্তঘেরা কক্সবাজার জেলায় রয়েছে চারটি সংসদীয় আসন। প্রতিটি আসনের বাস্তবতা ভিন্ন। কক্সবাজার শুধু পর্যটন শহর নয়, এটি দেশের দীর্ঘতম উপকূলের পাশাপাশি সমুদ্রবন্দরসংলগ্ন একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। এবারের নির্বাচনে এখানে জাতীয় পর্যায়ের দুই পরিচিত রাজনীতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ আলাদা আলাদা আসনে মাঠে নামায় কক্সবাজারের নির্বাচন জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
কক্সবাজার-১: চিত্র কি বদলাচ্ছে
চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত কক্সবাজার-১ আসনটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত সালাহউদ্দিন আহমদের কারণে। তিনি ও তাঁর স্ত্রী এই আসন থেকে চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। মঙ্গলবার ও বুধবার (৫ ও ৬ ডিসেম্বর) চকরিয়া ও পেকুয়ার বিভিন্ন ইউনিয়নে ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে জামায়াতের তরুণ প্রার্থী আবদুল্লাহ আল ফারুকের যে লড়াই অসম বলে ধারণা করা হয়েছিল, বাস্তবে সেটি ততটা সহজ নয়।
এ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী ছরওয়ার আলম কুতুবীও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলেও স্থানীয়দের মতে মূল লড়াই হবে সালাহউদ্দিন আহমদ ও আবদুল্লাহ আল ফারুকের মধ্যে। অনেকেই মনে করেন, চকরিয়া-পেকুয়ার অবকাঠামোগত উন্নয়নের বড় অংশের ভিত্তি সালাহউদ্দিন আহমদের হাত ধরেই তৈরি হয়েছে।
তবে জামায়াতের প্রার্থী আবদুল্লাহ আল ফারুকের উত্থান স্থানীয়ভাবে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পেকুয়ার চৌমুহনী এলাকায় কথা হয় নুরুল আমীনের সঙ্গে। তিনি লবণচাষি। তাঁর মতে, জাতীয় নেতা হিসেবে সালাহউদ্দিন আহমদের অবস্থান প্রশ্নাতীত, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর আচরণ নিয়ে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং গত এক থেকে দেড় বছরে তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার বেশি হয়েছে। অপরদিকে আবদুল্লাহ আল ফারুক বলেন, মানুষ দুর্নীতিমুক্ত দেশ চায় এবং জাতীয় নির্বাচনে জাতীয় ইস্যুই মুখ্য হয়ে ওঠে।
এই আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ৪০ হাজার। এর মধ্যে চকরিয়ায় ৩ লাখ ৯০ হাজার এবং পেকুয়ায় ১ লাখ ৪৬ হাজার ভোটার। দুই প্রার্থীর বাড়ি ভিন্ন উপজেলায় হলেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আঞ্চলিকতার প্রভাব কতটা পড়বে, তা নিয়ে হিসাব চলছে।
কক্সবাজার-২: আঞ্চলিক সমীকরণ বড় ফ্যাক্টর
মহেশখালী ও কুতুবদিয়া নিয়ে গঠিত কক্সবাজার-২ আসনটি পুরোপুরি দ্বীপাঞ্চল। এখানে জামায়াতে ইসলামীর এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ ও বিএনপির আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। দুজনই সাবেক সংসদ সদস্য। মোট ভোটার ৩ লাখ ৮৭ হাজারের বেশি। কুতুবদিয়া ও মহেশখালীর ভোটের ভারসাম্য এখানে বড় বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
হামিদুর রহমান আযাদ মনে করেন, আঞ্চলিকতার বিষয়টি অতীতেও কাজে আসেনি। তাঁর ভাষ্য, নির্বাচন সুষ্ঠু হলে জয়ের ব্যাপারে তিনি শতভাগ আশাবাদী। অপরদিকে বিএনপির প্রার্থী আলমগীর মাহফুজ উল্লাহ জানান, দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন আর নেই এবং সবাই এক কাতারে এসে গেছেন।
কক্সবাজার-৩ ও ৪: হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস
কক্সবাজার সদর, রামু ও ঈদগাঁও নিয়ে গঠিত কক্সবাজার-৩ আসনে পর্যটন, ব্যবসা, যানজট ও জীবনযাত্রার ব্যয় বড় ইস্যু। এখানে বিএনপির লুৎফর রহমান কাজল ও জামায়াতের শহীদুল আলম বাহাদুরের মধ্যে মূল লড়াই হবে বলে ধারণা। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নবীন হলেও বাহাদুর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছেন।
অন্যদিকে উখিয়া ও টেকনাফ নিয়ে গঠিত কক্সবাজার-৪ আসনে রোহিঙ্গা সংকট, মাদক ও মানব পাচার বড় আলোচনার বিষয়। এখানে বিএনপির শাহজাহান চৌধুরীর বিপরীতে জামায়াতের নূর আহমদ আনোয়ারী শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন।
একতরফা হাওয়া নেই
কয়েক দিন মাঠ ঘুরে যে চিত্র স্পষ্ট, তা হলো কক্সবাজারের কোনো আসনেই একতরফা হাওয়া নেই। ভোটাররা জাতীয় নেতা, স্থানীয় প্রভাব ও সাম্প্রতিক বাস্তবতার হিসাব মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চাইছেন। কলাতলীর চায়ের দোকানে মোস্তফার বলা কথাই যেন চার আসনের সারসংক্ষেপ—এবার হিসাবটা সত্যিই একটু আলাদা।
সিএ/এমই


