নির্বাচন সামনে রেখে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া নেতাদের বিষয়ে আপাতত সংযত কিন্তু দৃঢ় কৌশল নিয়েছে বিএনপি। দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাহারে রাজি করাতে এসব নেতাকে বোঝানোর চেষ্টা চলছে। তবে এতে কাজ না হলে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা, এমনকি বহিষ্কারের পথেও হাঁটবে দল—এমন ইঙ্গিত মিলেছে বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র থেকে।
দলীয় সূত্র জানায়, বিএনপি দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া নেতাদের ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে বিবেচনা করছে। তাঁদের বোঝাতে অঞ্চলভিত্তিক জ্যেষ্ঠ নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নিজ নিজ সাংগঠনিক এলাকায় তাঁরা বিদ্রোহী প্রার্থীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করছেন এবং দলীয় ঐক্য ও নির্বাচনী কৌশলের গুরুত্ব তুলে ধরছেন। একই সঙ্গে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করলে সম্ভাব্য সাংগঠনিক পরিণতির কথাও জানানো হচ্ছে।
এই উদ্যোগের ফলে ইতিমধ্যে কয়েকজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে সম্মত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দলীয় সূত্র। বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা বলছেন, ব্যক্তিপর্যায়ের এই আলোচনা দলীয় শৃঙ্খলার মধ্যেই হচ্ছে। কাউকে চাপ দেওয়া নয়, বরং দলীয় স্বার্থে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে শেষ পর্যায়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও আলোচনায় যুক্ত হতে পারেন বলে জানা গেছে।
তবে অঞ্চলভিত্তিক বোঝানোর এই প্রক্রিয়াকে বিদ্রোহীদের জন্য ‘শেষ সুযোগ’ হিসেবে দেখছে বিএনপি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেও মনোনয়ন প্রত্যাহার না করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরই মধ্যে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হওয়ার অভিযোগে ৯ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ এ প্রসঙ্গে বলেন, প্রতিনিয়ত তাঁদের বোঝানো হচ্ছে। এরপরও কেউ না বুঝলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই।
নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২০ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। এ সময়ের মধ্যে যাঁরা দলীয় প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবেন, তাঁদের সাধুবাদ জানানো হবে। তবে সময়সীমা পার হলে অবাধ্য বা শৃঙ্খলাভঙ্গকারী নেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে দলীয় সিদ্ধান্তে উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—কোনো আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকলেও নেতা-কর্মীরা দল মনোনীত প্রার্থী ছাড়া অন্য কারও পক্ষে কাজ করতে পারবেন না। নির্দেশ অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট ইউনিট বা কমিটিকেও দায়ী করা হবে।
বিএনপির নেতৃত্ব মনে করছে, বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে ভোটের মাঠে দলের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। সে কারণে দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষাই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।
প্রথম আলোর এক হিসাবে দেখা গেছে, সারা দেশের ১১৭টি আসনে বিএনপির ১১৯ জন নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে যাচাই-বাছাইয়ে কয়েকজনের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কোথাও দীর্ঘদিনের পুরোনো নেতা বাদ পড়া, কোথাও স্থানীয় নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব—এসব কারণেই বিদ্রোহী প্রার্থী বাড়ছে।
এদিকে যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের সঙ্গে ১৬টি আসনে সমঝোতা করলেও মাঠপর্যায়ে বাস্তবতা এখনো চ্যালেঞ্জিং। যেসব আসন বিএনপি শরিক দলগুলোকে ছেড়ে দিয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির সাংগঠনিক সহযোগিতা মিলছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও বিদ্রোহী প্রার্থীদের সক্রিয়তায় জোট প্রার্থীরা কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন।
এই পরিস্থিতিতে মিত্র দলের নেতারা বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সরাসরি হস্তক্ষেপ চাইছেন। তাঁদের মতে, তৃণমূলে কার্যকর সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হলে কেন্দ্র থেকে কঠোর ও স্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন।
সিএ/জেএইচ


