জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ এবং গণভোট অধ্যাদেশের বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টের রুল জারির পর বিষয়টি দেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। সামনের দিনগুলোতে এটি বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠবে কি না—তা নিয়ে কৌতূহল ও জল্পনা বাড়ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একযোগে অনুষ্ঠিত সংবিধান সংস্কার বিষয়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলেও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোটসঙ্গী এনসিপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ গ্রহণ করেছেন। বিষয়টি আদালতে গড়ানোয় জামায়াত ও এনসিপি ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘রাজনৈতিকভাবে অনেক ধরনের বক্তব্য আসতে পারে। কিন্তু যেসব বিষয়ে আদালতে রিট হয়েছে, সেসব বিষয়ে আদালত থেকে কী নির্দেশনা আসে সেটিও সংসদকে আইন প্রণয়নের সময় বিবেচনায় নিতে হবে।’ তার এই বক্তব্যের পর বিশ্লেষকদের মতে, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান—দুটোর ওপরই নির্ভর করবে পরিস্থিতির গতিপথ।
রিট ও আদালতের পর্যবেক্ষণ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে রাজনৈতিক দলগুলোর ধারাবাহিক আলোচনার ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ স্বাক্ষরিত হয়। একই বছরের ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।
এরপর ২৫ নভেম্বর গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করা হয়, যাতে সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে জনগণের সম্মতি যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং তাতে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়।
তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও গণভোট অধ্যাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবী হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন। রিটে বলা হয়, সংবিধানে গণভোট ও জুলাই জাতীয় সনদের কোনো বিধান নেই। তারা জানতে চান কেন গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংশোধন) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-কে অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না।
মঙ্গলবার শুনানি শেষে হাইকোর্ট জুলাই জাতীয় সনদ, গণভোট অধ্যাদেশ এবং নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার বৈধতা নিয়ে রুল জারি করেন। আইন সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জাতীয় সংসদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, নির্বাচন কমিশন ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে চার সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে।
জামায়াত ও এনসিপির প্রতিক্রিয়া
রুল জারির পর জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিষয়কে আদালতের বারান্দায় টেনে নেওয়া সমীচীন নয় এবং অতীতে এ ধরনের উদ্যোগ জাতীয় জীবনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে।
তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের আচরণে প্রতীয়মান হচ্ছে যে রাজনৈতিক দায় এড়িয়ে আদালতের ওপর চাপ সৃষ্টি করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের অপচেষ্টা চলছে। পরিকল্পিতভাবে রিট পিটিশন দায়ের করিয়ে পর্দার আড়াল থেকে ইন্ধন দেওয়া হলে তা হবে দ্বিচারিতা ও আত্মঘাতী পদক্ষেপ।’
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া অভিযোগ করেন, ‘বিএনপি ষড়যন্ত্রমূলকভাবে জুলাই সনদকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য ও সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতা করার জন্য আদালতে গিয়েছে। তারা একধরনের ডুয়েল গেম খেলছে।’
বিএনপির ব্যাখ্যা
বিএনপি বলছে, সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কোনো বিধান নেই। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘গণভোটের রায় অনুসারে জনগণের যে ইচ্ছে ও রায়ের প্রতিফলন ঘটাতে হলে সংসদে যেতে হবে আগে এবং সংসদে প্রয়োজনীয় আইন ও সংবিধান সংশোধন করতে হবে। বিদ্যমান সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কোনো বিধান নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ নামে সংবিধানে কিছু না থাকায় যারা সেই শপথ নিয়েছে সেটা তাদের ব্যাপার। ১২ মার্চ সংসদ শুরু হবে এবং এখানে শুধু সংসদ সদস্যরা যোগ দিবেন। অসাংবিধানিক কিছু আমরা জাতীয় সংসদে উত্থাপন করতে পারি না।’
বিশ্লেষকদের মত
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ক্ষমতাসীনদের প্রশ্রয়েই এ ধরনের রিট হওয়ার নজির বাংলাদেশে আছে। সে কারণেই বিরোধী দলগুলোর দিক থেকে এই রিটের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।’ তার মতে, বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির অবস্থানগত পার্থক্য স্পষ্ট এবং এ ইস্যুতে চাপ বাড়লে এটি বড় রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান মনে করেন, বিষয়টি রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠবে কি না তা নির্ভর করবে বিরোধী দলগুলো কতটা জনসমর্থন সংগঠিত করতে পারে এবং আদালতের সিদ্ধান্ত কী আসে তার ওপর।
সব মিলিয়ে আদালতের রুল, রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান ও সংসদে সম্ভাব্য পদক্ষেপ—এই তিনটি উপাদান আগামী দিনের রাজনীতিতে জুলাই সনদকে একটি কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত করতে পারে বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে পর্যবেক্ষকরা।
সিএ/এএ


