আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনী প্রচারণায় এবার স্পষ্টভাবে চোখে পড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যাপক ব্যবহার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও, ছবি ও অডিও ব্যবহার করে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে প্রচারণা চালানো হচ্ছে এবং প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতেও এসব কনটেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে। বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশে আয়োজিত হতে যাওয়া প্রথম নির্বাচনে এআই বড় একটি ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করতে পারে বলে আগেই সতর্ক করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা। বিষয়টি বিবেচনায় রেখে নির্বাচনী আচরণবিধিতেও এআই-সংক্রান্ত নীতিমালা অন্তর্ভুক্ত করেছে নির্বাচন কমিশন। তবে নির্বাচনী দিন যত ঘনিয়ে আসছে, সামাজিক মাধ্যমে এআই দিয়ে তৈরি আক্রমণাত্মক ভিডিওর সয়লাব সামাল দিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে এআই কনটেন্ট সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব থাকায় বিভ্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পহেলা জানুয়ারি থেকে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত ৮০০টির বেশি এআই নির্মিত ভিডিও পর্যালোচনা করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, নানা শ্রেণি-পেশার মানুষদের নিয়ে নির্মিত ভিডিওগুলোর সিংহভাগ জামায়াতকে সমর্থন করে বানানো।
বেশির ভাগ ভিডিও জামায়াতের সমর্থনে
উদাহরণ হিসেবে, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমানকে সাহায্য পাঠাতে জনসাধারণের কাছে বিকাশ নম্বর চাইতে দেখা যায়—এআই দিয়ে তৈরি এমন একটি ভিডিও কয়েক সপ্তাহ আগে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি তার মেয়ে জাইমা রহমানের নামে খোলা ভুয়া ফেসবুক আইডি থেকে পোস্ট করা হয়েছিল। ভিডিওটি শুধুমাত্র ফেসবুকেই প্রায় ২০ লাখ বার দেখা হয়েছে। এ ধরনের অসংখ্য এআই-নির্মিত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যেগুলোর ভিউ সংখ্যা লাখ ছাড়িয়েছে।
নির্বাচনী আচরণবিধির ১৬(ছ) ধারায় বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী বা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে, চরিত্র হনন বা সুনাম নষ্ট করতে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বা অন্য কোনো মাধ্যমে মিথ্যা, বিভ্রান্তকর, পক্ষপাতমূলক, বিদ্বেষপূর্ণ, অশ্লীল বা কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট তৈরি, প্রচার ও শেয়ার করতে পারবে না। ফলে প্রচারণার উদ্দেশ্যে আক্রমণাত্মক ও বিভ্রান্তিকর এআই কনটেন্ট স্পষ্টভাবে আচরণবিধি লঙ্ঘন করে।
এআই কনটেন্টের ধরন
ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী জানান, এআই নির্মিত ভিডিওগুলোর মধ্যে প্রচারণামূলক কনটেন্টের পাশাপাশি বিদ্বেষমূলক, আক্রমণাত্মক ও ষড়যন্ত্রতাত্ত্বিক কনটেন্টও রয়েছে। তিনি বলেন, ‘যে যার উদ্দেশ্য থেকে এই কনটেন্টগুলো তৈরি করছে। কেউ নির্বাচনের পক্ষে তৈরি করছে, কেউ বিপক্ষে। কেউ দলের পক্ষে তৈরি করছে, কেউ বিপক্ষে তৈরি করছে।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমের মাধ্যমে এসব কনটেন্ট ছড়িয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘এটা প্রযুক্তির কারণে সহজ হয়েছে এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে ব্যাপক হয়েছে।’
পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জামায়াতের সমর্থনে ছড়িয়ে দেওয়া ভিডিওগুলোতে বিএনপিকে চাঁদাবাজ ও প্রতারক হিসেবে দেখানো হচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপির সমর্থনে ছড়ানো এআই ভিডিওগুলোতে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় জামায়াতের বিতর্কিত ভূমিকার প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়েছে। দুই প্রধান রাজনৈতিক দলই এআই কনটেন্ট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং একে অপরকে দায়ী করেছে, তবে নিজেদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করছে।
নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি
নির্বাচন কমিশনের আইন-শৃঙ্খলা সমন্বয় সেলের মুখ্য সমন্বয়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, ‘ইউএনডিপির সঙ্গে আমরা একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছি, যা আচরণবিধির সাথে কাস্টমাইজ করা হয়েছে এবং এআইয়ের মাধ্যমে স্ক্যানিং ব্যবস্থা রয়েছে।’
তিনি জানান, গুরুতর প্রকৃতির কনটেন্ট যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ করতে পারে, কেবল সেগুলোই নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে যাচাই করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মকে জানানো হচ্ছে।
নিয়ন্ত্রণের সীমা
বিশ্লেষকরা মনে করেন, কম খরচে দ্রুত এআই কনটেন্ট তৈরি করা অনেক প্রার্থীর জন্য প্রচারণাকে সহজ করেছে এবং এক ধরনের ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করেছে। তবে এআই কনটেন্টে স্পষ্ট লেবেলিং নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত না হন। একই সঙ্গে ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সীমা নির্ধারণে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি হলেও দক্ষতা ছাড়া তা করতে গেলে সাধারণ সমালোচনাও দমন হয়ে যেতে পারে। এই ক্যাপাসিটি ইলেকশন কমিশনের কতটুকু আছে আমার জানা নাই।’
সিএ/এএ


