ঈদুল ফিতরকে ঘিরে ছুটি শুরু হলেই বদলে যায় রাজধানী ঢাকার চিত্র। ব্যস্ত এই শহরের অসংখ্য ফ্ল্যাট ফাঁকা হয়ে পড়ে, কারণ অনেকেই গ্রামের বাড়ি, আত্মীয়স্বজনের বাসা কিংবা ভ্রমণে চলে যান। এই সময়টিকেই সুযোগ হিসেবে নেয় অপরাধী চক্র। ফাঁকা বাসা লক্ষ্য করে চুরি ও লুটপাটের ঝুঁকি বেড়ে যায় বলে জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
তাঁদের মতে, প্রতি বছরই ঈদের আগে ও পরে তালা ভেঙে বা জানালার গ্রিল কেটে বাসায় ঢোকার ঘটনা বাড়ে। যেসব বাসায় আগে থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় না কিংবা ভবনের নিরাপত্তাব্যবস্থা দুর্বল থাকে, সেসব জায়গা বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। একই সঙ্গে ঈদযাত্রা ও কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে বিপণিবিতান, কাঁচাবাজার, বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট ও রেলস্টেশন এলাকাতেও সক্রিয় হয়ে ওঠে অপরাধীরা।
এবার টানা সাত দিনের ছুটির কারণে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাই বাসা ছাড়ার আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, চোরেরা সাধারণত আগে থেকেই সম্ভাব্য লক্ষ্য নির্ধারণ করে। কোনো বাসা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকবে কি না, সেখানে সিসিটিভি আছে কি না কিংবা নিরাপত্তাকর্মীরা কতটা সতর্ক—এসব তথ্য যাচাই করে তারা সুযোগ নেয়।
এ ছাড়া অস্থায়ী গৃহকর্মী, ডেলিভারি কর্মী বা মিস্ত্রিদের যাতায়াত থেকেও অনেক সময় বাসার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাইরে চলে যেতে পারে। ফলে শুধু তালা লাগালেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না, বরং দরকার সামগ্রিক প্রস্তুতি। বাসার প্রধান দরজার পাশাপাশি জানালা, বারান্দা ও রান্নাঘরের গ্রিল ভালোভাবে বন্ধ আছে কি না, তা যাচাই করে বের হতে হবে। মানসম্মত তালার পাশাপাশি অতিরিক্ত লক বা ডিজিটাল লক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সতর্ক থাকার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বাসা ফাঁকা থাকবে—এমন তথ্য বা ভ্রমণের ছবি তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এতে অপরাধীরা সহজেই ফাঁকা বাসা সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে।
মূল্যবান জিনিসপত্র সংরক্ষণ নিয়েও সতর্কতা জরুরি। নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র বাসায় ছড়িয়ে না রেখে নিরাপদ স্থানে রাখতে হবে। প্রয়োজনে ব্যাংকের লকার বা বিশ্বস্ত কারও কাছে সংরক্ষণের কথা ভাবা যেতে পারে। ঢাকা মহানগর পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার নগরবাসীকে পরামর্শ দিয়েছেন, আত্মীয়স্বজন না থাকলে থানায়ও মূল্যবান জিনিসপত্র রাখা যেতে পারে।
এ ছাড়া বাসা ছাড়ার আগে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সংযোগ পরীক্ষা করে যাওয়া, সিসিটিভি ক্যামেরা সচল রাখা এবং বাসার আশপাশে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ সময় বাইরে থাকলে নিকট আত্মীয় বা বিশ্বস্ত প্রতিবেশীকে বিষয়টি জানিয়ে রাখলে তারা মাঝেমধ্যে খোঁজ নিতে পারবেন।
নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, চোর চক্র সাধারণত অন্ধকার ও নিস্তব্ধ বাসাকে লক্ষ্য করে। তাই টাইমার লাইট বা স্বয়ংক্রিয় আলো ব্যবহার করা যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে রান্নাঘরের গ্রিল কেটে চুরি হয়, তাই সেখানে আলো জ্বালিয়ে রাখাও কার্যকর হতে পারে।
বহুতল ভবনে নিরাপত্তাকর্মীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দর্শনার্থী বা নতুন আগতদের পরিচয় যাচাই, নিবন্ধন এবং সন্দেহজনক গতিবিধির প্রতি নজর রাখা প্রয়োজন। ঈদের সময় দায়িত্বে শিথিলতা দেখা দিলে সেটি অপরাধীদের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে ঈদযাত্রা ও কেনাকাটার সময়ও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ভিড়ের মধ্যে মুঠোফোন, মানিব্যাগ বা গয়না নিয়ে অসতর্ক থাকলে ছিনতাইয়ের ঝুঁকি থাকে। বড় অঙ্কের টাকা বহন না করা, নির্জন এটিএম বুথ এড়িয়ে চলা এবং অপরিচিত কারও দেওয়া খাবার গ্রহণ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
গৃহকর্মী, চালক বা ভাড়াটের তথ্য সংরক্ষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, ফোন নম্বর ও ঠিকানা সংরক্ষণ করলে অপরাধ প্রতিরোধে সহায়তা পাওয়া যায়। কোনো সন্দেহজনক ঘটনা দেখলে দ্রুত থানা বা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ জানাতে বলা হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ঈদ আনন্দের উৎসব হলেও অসচেতনতা থাকলে এটি অপরাধীদের জন্য সুযোগ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই ব্যক্তি, পরিবার, ভবন কর্তৃপক্ষ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই সময়ে চুরি ও অপরাধের ঝুঁকি কমাতে।
সিএ/এমই


