সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার আবদুল গণি সত্তরোর্ধ্ব বয়সেও ছেলেকে গ্রিসে পাঠানোর জন্য সহায়-সম্বল বিক্রি করেছেন। কিন্তু সেই ছেলে, সাজিদুর রহমান, ভূমধ্যসাগরে মারা গেছেন। পরিবার এখন মুঠোফোনে তাঁর ছবি দেখে কাঁদছে।
মানব পাচারের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার অনেক উদাহরণ দেখা গেছে। পটুয়াখালীর দেলোয়ার হোসেন লিবিয়ায় গিয়ে কারাগারে পড়েন। বাংলাদেশি তরুণরা কাজের খোঁজে বা উন্নত জীবনের স্বপ্নে দালালের হাতে টাকা দিয়ে পাঠানো হয়। কেউ কারাগারে পড়ে, কেউ অপহরণ বা জোরপূর্বক নিপীড়নের শিকার হন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, মানব পাচার এখন একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে ৪৮ আরোহীর মধ্যে ২৬ জনই জীবিত উদ্ধার হয়; বাকি ২২ জন নিখোঁজ বা নিহত।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২০–২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, মানব পাচারের ৪ হাজার ৪২৭ মামলার ৯৪–৯৫ শতাংশ আসামি খালাস পেয়ে যান। পুলিশের তথ্যও দেখাচ্ছে, ৫৩৬ মামলার মধ্যে ১ হাজার ৬৫৭ জনের মধ্যে মাত্র ৩৫৩ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। অপরাধ প্রমাণের জন্য প্রমাণাদি সংগ্রহ কঠিন হওয়ায় মামলাগুলো দুর্বল হয়।
মানব পাচারের রুটগুলোও অত্যন্ত জটিল। বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা পর্যন্ত বিভিন্ন পথ ব্যবহার করা হচ্ছে। লিবিয়া মানব পাচারের সবচেয়ে বিপজ্জনক গন্তব্য। ২০২২–২০২৫ সালে লিবিয়া থেকে ৬ হাজার ২৬০ জন বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা হয়েছে।
পাচারের ধরন বদলাচ্ছে। বিদেশি নাগরিক ও স্থানীয় দালালরা যুক্ত হচ্ছে। শিক্ষার, বিয়ের বা চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ভুক্তভোগীকে বহুদেশে পাঠানো হচ্ছে। জাল ভিসা ব্যবহার করে অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপে পাঠানোর একটি চক্রও ধরা পড়েছে।
সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, দেশীয় সাতটি জেলা মানব পাচারের ‘হটস্পট’—মাদারীপুর, শরীয়তপুর, যশোর, কক্সবাজার, কুমিল্লা, সিলেট ও ফরিদপুর। এখান থেকে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা বেশি।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রামরুর নির্বাহী পরিচালক তানসিম সিদ্দিকী বলেন, পাচারের রুট বহুমাত্রিক ও বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সমন্বয় ছাড়া এই নেটওয়ার্ক দমন করা কঠিন। তবে রাষ্ট্র যদি কঠোর পদক্ষেপ নেন, অন্তত দেশের ভেতরে মানব পাচার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
সিএ/এমই


