চট্টগ্রাম নগরে জ্বালানি তেলের সংকটে ফিলিং স্টেশন ঘুরেও অনেক চালক তেল পাচ্ছেন না। এমন পরিস্থিতিতে চারটি পাম্প ঘুরে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে শেষ পর্যন্ত মাত্র ৩০০ টাকার অকটেন সংগ্রহ করতে পেরেছেন মোটরসাইকেলচালক আবদুর রহিম।
আজ সোমবার সকালে নগরের রাহাত্তারপুল এলাকা থেকে তেল নেওয়ার জন্য বের হন তিনি। প্রথমে এলাকার একটি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে তেল পাননি। পরে হাশিমখালের সেনা ফিলিং স্টেশন ও ষোলশহরের ফসিল ফিলিং স্টেশনেও একই অবস্থা পান। কোথাও অকটেন না থাকায় তাঁকে অন্য পাম্পের খোঁজে ঘুরতে হয়।
ষোলশহরের ফসিল ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে অকটেন বিক্রি বন্ধ। নিরাপত্তাকর্মীরা মোটরসাইকেলচালকদের জানাচ্ছিলেন, স্টেশনে অকটেন নেই। ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, একের পর এক মোটরসাইকেল এসে আবার ফিরে যাচ্ছে।
স্টেশনটির হিসাবরক্ষক মো. আবসার জানান, গত ২৭ মার্চ তারা সাড়ে চার হাজার লিটার অকটেন পেয়েছিলেন। এরপর আর নতুন করে সরবরাহ আসেনি। পদ্মা অয়েল থেকে জানানো হয়েছে, আরও এক-দুই দিনের আগে তেল পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই অকটেন বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে।
তেল না থাকলেও চালকদের ভিড় কমেনি। মোটরসাইকেলচালক মোহাম্মদ রেজাউল বলেন, এক সপ্তাহ আগে শেষবার তেল নিয়েছিলেন। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন এবং প্রতিদিন শহরের বিভিন্ন এলাকায় যেতে হয়। তাঁর ভাষ্য, সরকার বলছে সংকট নেই, কিন্তু বাস্তবে পাম্পে এসে তেল পাওয়া যাচ্ছে না।
ঘণ্টাখানেক অপেক্ষার পর ৩০০ টাকার তেল
ফসিল ফিলিং স্টেশন থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরের দামপাড়া এলাকার এস এইচ খান অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনে গিয়ে রহিমকে আবার দেখা যায়। সেখানে তেল থাকলেও দীর্ঘ লাইন ছিল।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে লাইনের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষার পর তাঁর পালা আসে। তখন জানানো হয়, একজনকে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকার তেল দেওয়া হবে। শেষ পর্যন্ত সেই পরিমাণই নিতে পারেন তিনি।
রহিম বলেন, ১৫ কিলোমিটার ঘুরে মাত্র ৩০০ টাকার তেল পেয়েছেন। অন্তত ৫০০ টাকার তেল পেলে দুই দিন মোটরসাইকেল চালাতে পারতেন। তিনি ছোট ব্যবসা করেন এবং প্রতিদিন শহরের বিভিন্ন এলাকায় যেতে হয়।
ফিলিং স্টেশনটির হিসাবরক্ষক মোহাম্মদ মানিক বলেন, ডিজেলের সরবরাহ আপাতত স্বাভাবিক থাকলেও অকটেন আসছে চাহিদার প্রায় অর্ধেক। তাই সীমিত পরিমাণে তেল বিক্রি করতে হচ্ছে।
পাম্পে পাম্পে ‘অকটেন নেই’
নগরের হাশিমখাল মোড়ের সেনা ফিলিং স্টেশনের ফটকেও ‘অকটেন নেই’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা যায়। তারপরও অনেক চালক ভেতরে ঢুকে তেল কবে আসবে জানতে চাইছিলেন। স্টেশনের কর্মচারীরা জানান, বিকেলের দিকে সরবরাহ আসতে পারে।
দামপাড়ার সিএমপি ফিলিং স্টেশনেও দুপুর পর্যন্ত বিক্রি বন্ধ ছিল। ফটকের সামনে বাঁশ ও ড্রাম দিয়ে ঘেরাও করে রাখা হয়। একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যায় টাইগারপাস এলাকার একটি স্টেশনেও, যেখানে ডিজেল বিক্রি চললেও অকটেন পাওয়া যাচ্ছিল না।
গণি বেকারি মোড়ের কিউ সি ট্রেডিং ফিলিং স্টেশনে প্রায় আধা কিলোমিটারজুড়ে যানবাহনের লাইন দেখা যায়। প্রাইভেট কারচালক মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, সকাল সাড়ে ১০টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন, দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটছে।
মোটরসাইকেলচালক মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়া জানান, প্রতিদিন মোটরসাইকেল চালিয়ে তিনি এক থেকে দেড় হাজার টাকা আয় করেন। কিন্তু তেলের জন্য দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হওয়ায় আয় কমে যাচ্ছে।
সরবরাহ কমে চাপ বেড়েছে
দেশে জ্বালানি তেল আমদানির দায়িত্ব বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি)। আর সরবরাহ করে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রয়োজন অনুযায়ী সরবরাহ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে অনেক ফিলিং স্টেশন আগের তুলনায় দ্বিগুণ বা তিন গুণ চাহিদা দিচ্ছে, এতে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে।
পেট্রলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন চট্টগ্রামের সভাপতি আহসানুর রহমান চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম বিভাগে দুই শতাধিক ফিলিং স্টেশন থাকলেও চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে অকটেন ও পেট্রলের ঘাটতি বেশি হওয়ায় চালকদের ভোগান্তি বাড়ছে।
তিনি আরও জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মোটরসাইকেলচালকদের একটি কার্ডের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে কে কতটুকু তেল নিচ্ছেন, তা নথিভুক্ত থাকবে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় কিছুটা শৃঙ্খলা আনা সম্ভব হবে।
সিএ/এমই


